মধ্যপ্রাচ্যের ৩ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরে জোর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের (ইউএনজিএ) সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল চার দিনে সব মিলিয়ে ৮০টি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।

এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ইউএনজিএতে ভাষণ দেওয়াসহ প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন; বৈঠক করেছেন ১১ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন গতকাল শনিবার জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে (ইউএনপিএম) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ বিষয়গুলো জানান।

মাহ্দী আমিন বলেন, জাতিসংঘকেন্দ্রিক প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রমকে মূলত কয়েকটি ভাগে দেখা যায়। প্রথমত, সাধারণ পরিষদের মূল ধারার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আটটি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য প্রদান, জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রাতরাশ অনুষ্ঠান ও ইউএনজিএর উদ্বোধনী অধিবেশন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্প আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি সস্ত্রীক অংশ নেন।

ইউএনজিএর পাশে রোহিঙ্গা ও জলবায়ুর ক্ষয়ক্ষতিসহ চারটি বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে একটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য রাখেন। মাহ্দী আমিন বলেন, জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কেবল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখাই তুলে ধরেননি, বরং সারা বিশ্বে কীভাবে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার একটি বলিষ্ঠ বৈশ্বিক দর্শন উপস্থাপন করেছেন।

তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, হাইতির প্রধানমন্ত্রী অ্যালিক্স দিদিয়ের ফিস-আইমে, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে প্লেনকোভিচ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ হুসেইন মোহমেদ লতিফ, কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহ, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সল বিন ফারহান বিন আবদুল্লাহ আল সউদ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন। দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে বৈঠকের মধ্যে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক আলাদাভাবে শুক্রবার রাতে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কুয়েত, সৌদি আরব এবং ইউএইর সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করে জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।

দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সব বৈঠকে দেশগুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানায়।

সফরের শেষ দিন তারেক রহমান গতকাল বিশ্বখ্যাত জেপি মর্গান চেস আয়োজিত ‘ব্রেকফাস্ট মিটিং উইথ ্ওয়াল স্ট্রিট’ কর্মসূচিতে যোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রথম সারির প্রায় ২০টি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের তার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাত আয়োজিত এই খোলামেলা আলোচনায় বাংলাদেশের বিশেষ করে আর্থিক খাতে কীভাবে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার, বোয়িং গ্লোবাল, গেট্স ফাউন্ডেশন, ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারী, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশ কমিউনিটির সঙ্গে বৈঠক করেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্কের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী গুম, খুন, হামলা, মামলা ও বাকস্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে বিগত দিনে কমিশনের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানান। অন্যদিকে সত্য ও ন্যায্যতাকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরায় নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানায় মানবাধিকার কমিশন। মাহ্দী আমিন বলেন, সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া দল বিএনপি যেহেতু আজ রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তাই সব শহীদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে পুনর্র্নির্মাণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান নিউ ইয়র্কে মোট আটটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং এর চারটিতে বক্তব্য রাখেন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, দুই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীসহ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আরও প্রায় ৪২টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক যেতে ঢাকা ছাড়েন। এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে নিউ ইয়র্ক সময় শুক্রবার রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে তারা ঢাকার পথে নিউ ইয়র্ক ছেড়েছেন। আজ রবিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে তাদের ঢাকা পৌঁছানোর কথা রয়েছে।