জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

নাগরিকদের মর্যাদার দৃঢ় অঙ্গীকার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান তারেক রহমানের ২১ মিনিটের মাতৃভাষা বাংলায় প্রদত্ত ভাষণটিকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্ববহ মনে করি। ২৬ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরসহ সহযোগী সংবাদমাধ্যমগুলোতে ভাষণের বিবরণে স্পষ্ট, শুধু সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে উঠে আসেনি, দূরদর্শী দিকনির্দেশনাও রয়েছে। ‘রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। তাই গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়েই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাষ্ট্রের নাগরিক মর্যাদার বিষয়টিকে সমুন্নত করেছে। উল্লেখ্য, তার বাবা জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট এবং মা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষণে বাংলাদেশ নিয়ে তার স্বপ্নের অধ্যায়ও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ। দলমত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য।’

আমরা মনে করি, কল্যাণকামী রাষ্ট্র, শান্তি ও সহাবস্থানপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা যদি এই সমপ্রত্যয়ে প্রত্যয়ী হন তাহলে বিদ্যমান অস্থিতিশীল বিশ্বে ছড়াবে স্বস্তির আলো। বিশে^র বিভিন্ন দেশে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ¦ালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানের পথনির্দেশ সাধুবাদযোগ্য। মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও ধর্মীয় উগ্রবাদীরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১২ লাখেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে। বাংলাদেশ কীভাবে ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের প্রতিপালন করে আসছে এবং এর ফলে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপের বিষয়টি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংগতই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে সমর্থন কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকে সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছেন। আমাদের প্রত্যাশা, এই মানবিক সংকট নিরসনে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর সহযোগিতা করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের শিবির-জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়াস আরও জোরদার করবে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা সর্বজন স্বীকৃত।

আমরা আরও মনে করি, বিদ্যমান বিশ^ বাস্তবতায় জাতিসংঘের কাছে বিশ^বাসীর প্রত্যাশা সংগতই বহুমাত্রিক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে বৈশি^ক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সংগতি রেখে আরও বাড়তি প্রত্যাশা আবর্তিত হয়েছে। আমরা জানি, ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ^শান্তি রক্ষা এবং মানবজাতির কল্যাণে জাতিসংঘ কাজ করে যাচ্ছে। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘকে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে সৃষ্ট যুদ্ধ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক গৃহযুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘের অধিকতর জোরালো ও কার্যকর ভূমিকা স্বস্তি-স্থিতিশীলতা-শান্তির পারিপার্শ্বিক অবস্থা তৈরির পরিবেশ নিশ্চিত করবে এটিই শান্তিপ্রিয় সবার প্রত্যাশা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই প্রেক্ষাপটেই তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বিশে^র যেকোনো প্রান্তে জাতিগত নিধন, যুদ্ধাপরাধ এবং স্বৈরাচারী শাসকদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘকে নির্মোহ কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় দ্রুত মানবিক সহায়তা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে ভূমণ্ডলের সুরক্ষা, উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যকার অর্থনৈতিক ব্যবধান কমাতে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণেও সমগুরুত্বেই ভূমিকা নিতে হবে।

আমরা এও জানি, জাতিসংঘের কাছে প্রত্যাশা অনেক হলেও এর কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা দেখছি, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে। জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী এবং স্বাধীন সংস্থায় রূপান্তর করার বিশ্বজুড়ে যে দাবি রয়েছে তার প্রতি গুরুত্ব দেওয়াও বাঞ্ছনীয়। জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে আমরা মনে করি।