সুন্দরবন দেখতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসেন। কেউ আসেন বনের ভেতরের বন্যপ্রাণী দেখতে, কেউ নদীপথে ঘুরতে, আবার কেউ সুন্দরবনের প্রকৃতি উপভোগ করতে। কিন্তু সুন্দরবনের এত কাছে থেকেও কয়রার অনেক জায়গা এখনো পর্যটকদের কাছে সেভাবে পরিচিত নয়।
সুন্দরবনসংলগ্ন উপজেলা খুলনার কয়রা। এখানকার নদী, খাল, গ্রাম, সবুজ প্রকৃতি, উপকূলের মানুষের জীবনযাপন—সবকিছু মিলিয়ে পর্যটনের জন্য আলাদা সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে সুন্দরবন দেখতে আসা পর্যটকদের কয়রায় আরও বেশি সময় রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবনকে সামনে রেখে কয়রাকে পর্যটনের একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। শুধু সুন্দরবনের একটি-দুটি জায়গায় পর্যটক পাঠানোর বদলে কয়রা থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং একই সঙ্গে কয়রার স্থানীয় দর্শনীয় স্থানগুলোকে পর্যটন রুটে যুক্ত করা যেতে পারে।
সুন্দরবনে করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চরসহ বেশ কয়েকটি পরিচিত পর্যটন এলাকা রয়েছে। এসব জায়গার একেকটির আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোথাও বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ বেশি, কোথাও পাখির দেখা মেলে, আবার কোনো জায়গায় নদী ও সাগরের কাছাকাছি প্রকৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
এসব গন্তব্যকে মাথায় রেখে কয়রাকে সুন্দরবন ভ্রমণের একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা করা যেতে পারে। পর্যটকেরা কয়রায় এসে থাকতে পারেন, স্থানীয় নৌযানে সুন্দরবনের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে পারেন এবং ফিরে এসে কয়রার আশপাশের নদী-গ্রাম ঘুরে দেখতে পারেন। এতে পর্যটকেরা সুন্দরবন দেখার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবনও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন।
শুধু সুন্দরবনকে সামনে রাখলে কয়রার পর্যটনের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না। উপজেলার নিজেদের কিছু দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানও পর্যটন পরিকল্পনায় যুক্ত করা দরকার।মসজিদকুঁড়ের নয় গম্বুজ মসজিদ এবং উত্তর বেদকাশীতে রাজা প্রতাপাদিত্যের ঐতিহাসিক স্থাপনার কথা এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। এ ছাড়া ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের কেওড়াকাটায় পর্যটন স্পট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জায়গাটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় পর্যটকদের পাশাপাশি সুন্দরবন দেখতে আসা মানুষেরও আগ্রহ তৈরি হতে পারে। গোবরা, মদিনাবাদ ও কয়রা সদরসংলগ্ন এলাকাগুলোতেও নদী ও গ্রামীণ পরিবেশকে ঘিরে ছোট ছোট পর্যটন স্পট তৈরি করা সম্ভব। সেখানে নৌভ্রমণ, সূর্যাস্ত দেখা, স্থানীয় খাবার খাওয়া কিংবা গ্রামের স্বাভাবিক জীবন দেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
কয়রায় পর্যটন বাড়লে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন স্থানীয় মানুষ। পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য নৌকা লাগবে, গাইড লাগবে, খাবারের ব্যবস্থা লাগবে। কেউ স্থানীয় পণ্য বিক্রি করতে পারবেন, কেউ ছোট খাবারের দোকান বা থাকার ব্যবস্থা করতে পারবেন।
স্থানীয় নারীরাও ঘরে তৈরি খাবার, হস্তশিল্প কিংবা বিভিন্ন পণ্য পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতে পারেন। তরুণদের জন্যও গাইড, নৌযান, পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন বাড়লে এর প্রভাব শুধু পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গ্রামের অনেক মানুষই এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। তবে পর্যটন বাড়াতে গিয়ে সুন্দরবনের ক্ষতি করা যাবে না। বেশি পর্যটক, প্লাস্টিক ও বর্জ্য, শব্দদূষণ বা অনিয়ন্ত্রিত নৌযান সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই পর্যটন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশিক্ষিত গাইড, নির্দিষ্ট নৌপথ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের ব্যবস্থা করা দরকার। কোন এলাকায় কতজন পর্যটক যেতে পারবেন, কোন পথে নৌযান চলবে—এসব বিষয় বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনেই ঠিক করতে হবে।
কয়রার জন্য একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে ‘কয়রা-সুন্দরবন’ নামে একটি পর্যটন রুট তৈরি করা। যেখানে সুন্দরবনের পাশাপাশি কয়রার নদী, গ্রাম, ঐতিহাসিক স্থান ও স্থানীয় জীবনযাপনও থাকবে। একজন পর্যটক সকালে কয়রার কোনো একটি জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন। এরপর নৌপথে সুন্দরবনের কোনো নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে পারেন। আবার ফিরে এসে স্থানীয় খাবার খেয়ে নদী বা গ্রাম ঘুরে দেখতে পারেন। এভাবে কয়রায় পর্যটকদের থাকার সময় বাড়ানো গেলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়তে পারে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে সুন্দরবনকে ঘিরে তাই নতুন করে ভাবার সুযোগ এসেছে। সুন্দরবনকে শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য হিসেবে না দেখে এর আশপাশের জনপদকেও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা হলে সুন্দরবন হবে মূল আকর্ষণ, আর কয়রা হতে পারে সেই আকর্ষণের সঙ্গে স্থানীয় মানুষ, নদী, গ্রাম ও উপকূলের জীবনকে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তখন সুন্দরবন দেখতে আসা মানুষ শুধু বনের সৌন্দর্য দেখে ফিরে যাবেন না। তাদের ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হবে কয়রার গল্পও। আর পর্যটনের সেই সুফল পৌঁছাতে পারে উপকূলের সাধারণ মানুষের ঘরেও।