বিশ্ব পর্যটন দিবস

পরিবেশে প্রভাব ফেলছে হোটেল-রিসোর্টের অপিরকিল্পত অবকাঠামো

বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বে প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর দিনটি পালিত হয়। এ উপলক্ষে বান্দরবানে জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যের তীর্থভূমি বান্দরবান। জেলার সাত উপেজলায় অসংখ্য পর্যটন স্পটের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বছরজুড়ে হাজার হাজার পর্যটক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসেন। এ জেলায় রয়েছে প্রায় ৪৬টি দর্শনীয় স্থান। এসব দর্শনীয় স্থানগুলোতে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের রাত্রি যাপনের জন্য জেলায় গড়ে ওঠেছে সরকারি-বেসরকারিভাবে অসংখ্য হোটেল-রিসোর্ট।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো জেলা সদর ও কোন উপেজলায় কি পরিমাণ রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, তার সুনির্দিষ্ট তালিকা জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস কারও কাছে নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, জেলায় গুটি কয়েক হোটেল ও দুই-একটি ইকো রিসোর্ট পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নিলেও অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টেরই অনুমোদন নেই। জেলার লামা, আলীকদম, রুমা, থানিছসহ বেশ কিছু উপজেলায় পরিবেশ ধ্বংস করে পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে উঠেছে ইকো নামধারী এসব রিসোর্ট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লামা উপজেলায়। এসব রিসোর্ট নির্মাণে মানছে না নিয়মনীতি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই পাহাড় কেটে এবং বনভূমির গাছ নিধন করে রিসোর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। এমনকি রাতারাতি ঘর তুলতে গিয়ে প্রাকৃতিক জলাধারও ধ্বংস করা হচ্ছে। 

মেঘ, পাহাড় আর বাতাসের যেন আজন্ম বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে ও ঝির-ছড়ার প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মাটি ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে এসব হোটেল-রিসোর্ট।

লামা উপেজলার মিরঞ্জা পাহাড় এলাকায় বনাঞ্চল ধ্বংস ও পাহাড় ন্যাড়া করে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৯০টি অবৈধ কটেজ। যার অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে বাঁশ, কাঠ ও ছন। আর এ কারণেই পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।

আইনের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা এসব রিসোর্ট বনের পরিবেশের ক্ষতি করছে। হোটেল-রিসোর্ট এলাকায় স্থায়ী ময়লার ভাগাড় না থাকায় পর্যটকদের ফেলে দেওয়া চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল বন সংলগ্ন ঝির-ছড়া কিংবা নদীর পানি দূষিত করছে। এছাড়া বাধ্য হয়ে পাহাড়ের নিচে বসবাসকারীরাও খাবার পানিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে দূষিত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

পাহাড়ের গাছপালা ও পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে ভিউ পয়েন্ট। ছবি: প্রতিনিধি

লামার ইয়াংছা পাড়ার বাসিন্দা মংচিং মার্মা বলেন, রিসোর্ট বর্জ্যের কারণে আমাদের একমাত্র পানির উৎস ঝিরর পানি অনেক দুর্গন্ধ। তবুও রান্না-বান্নাসহ এ পানিই ব্যবহার করতে হচ্ছে । এটি ঠেকাতে না পারলে ব্যবসায়ীরা সুন্দর এ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে ফেলবে খুব শিগগিরই।

পরিবেশ দূষণের আরও একটি দিক হচ্ছে রাবার প্লান্টেশেনর নামে জমি ইজারা নিয়ে কটেজ তৈরি।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জানায়, লামার মিরঞ্জা পাহাড় এলাকার অধিকাংশ জায়গা রাবার প্লান্টেশেনর জন্য লিজ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের নামে বন্দোবস্তকৃত জায়গায় জুমঘর তৈরির মাধ্যেম পর্যটকদের নজর কাড়তে শুরু হয় কটেজ নির্মাণ প্রতিযোগিতা। এরপর থেকে ওই এলাকায় শুরু হয় নামে-বেনামে একের পর এক কটেজ নির্মাণের কাজ।

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজৈনিতক নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করে সেখানকার স্থানীয় ম্রো, ত্রিপুরা ও মার্মাদের জায়গাও দখল করা হয়।

মিরিঞ্জা ভ্যালি রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান জানিয়েছন, মিরিঞ্জা পাহাড়ে প্রায় ৮৯টির মত রিসোর্ট রয়েছে। সেসব রিসোর্টগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। তবে পর্যটন করপোরেশন থেকে রিসোর্ট পরিচালনাসহ সচেতনতার জন্য দুইবার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

দেশের বিভিন্ন দূর দুরান্ত এলাকা থেকে আসা পর্যটকরা। ছবি: প্রতিনিধি

লামার মিরিঞ্জাসহ পাহাড়ে গড়ে ওঠা পর্যটন স্পটগুলো যেন পদে পদে বিপদের উৎস। অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজগুলো কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত। যেগুলোতে নেই নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নেই পানির উৎসও। এসব স্থানে অর্ধশতাধিক রিসোর্ট, কেটজ, অবকাশ যাপন কেন্দ্র ও ছোট-বড় রেঁস্তোরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়েছে। ফলে যে কোন সময় অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

লামা-চকরিয়া সড়কে মিরিঞ্জা পাহাড়সহ উঁচু উঁচু পাহাড়গুলোতে খেয়াল খুশি মত গড়ে উঠেছে অসংখ্য রিসোর্ট। গহীন অরণ্যে এসব রিসোর্ট কিংবা শক্ত ভিত্ত নেই, ওয়াল কিংবা স্থায়ী পিলার নেই। কিছু কটেজ এমন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে সামান্য পাহাড়ধস, অতিবৃষ্টি বা প্রবল বাতাসেই ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অনিয়িন্ত্রত রিসোর্ট ব্যবসার ফলে একদিকে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, অন্যদিকে বাড়ছে সামাজিক অশান্তি। এখনই নিয়ন্ত্রেণ আনা না গেল প্রকৃতি ও পরিবেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই অপরিবর্তনীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।

বান্দরবানের পরিবেশকর্মী প্রিন্স মাহমুদ বলেন, রিসোর্ট তৈরিতে বাঁশ ও কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। বাস্তবে এগুলো কিছু মালিকানা বাগানের হলেও অধিকাংশ প্রাকৃতিক বনের গাছ। রিসোর্টে এসি ও জেনারেটর চালানো হচ্ছে। সারাক্ষণ সাউন্ড সিস্টেম বাজছে। এতে উচ্চ শব্দের কারেণ পশুপাখিরা এলাকা থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। একে একে গড়ে ওঠা এসব রিসোর্টের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ঠেকাতে না পারলে পাহাড়কে গলা টিপে হত্যা করবে রিসোর্টের ব্যবসায়ীরা।

রিসোর্ট থেকে পর্যটকদের ফেলে দেওয়া চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতলসহ নানা বর্জ্য। ছবি: প্রতিনিধি

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষেণর বান্দরবান চ্যাপ্টারের চেয়ারপারসন জুয়ামিলয়ান আমলাই বলেন, গত কয়েক বছরে বড় বড় পাহাড়ের চুড়ায় একের পর এক গড়ে উঠেছে ইকো নামধারী রিসোর্ট-কটেজ। এসব এলাকায় রিসোর্ট বা কটেজ নির্মাণ করতে গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু গড়ে ওঠা কটেজ ও রিসোর্টগুলোর বেশির ভাগই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। এতে ভয়াবহ বিপদ আসবে। দ্রুত এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করেত হবে বলে মনে করছেন তিনি।

রিসোর্টে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই স্বীকার করে লামা রিসোর্ট মালিক সমিতির এডহক কমিটির আহ্বায়ক দেলায়ার হোসেন রফিক বলেন, এখানে মোট কতটি রিসোর্ট বা কটেজ রয়েছে তার হিসাব আমাদের কাছে নেই। এখানে একটা সমিতি থাকলেও কেউ কারোর কথা শুনছে না। তাছাড়া এগুলো রিসোর্ট না জুমঘর বানিয়ে রিসোর্ট নামে ব্যবসা করছে। আমরা চাই নীতিমালা হোক। পাহাড়ের কোনে ক্ষতি চাই না। প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেই ব্যবসা করতে চাই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব বলেন, তাদের কাছ থেকে ৩২টি পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েছে। ২০টি কক্ষ বা তার বেশি কক্ষের রিসোর্টের ছাড়পত্র পরিবেশ অধিদপ্তর দিয়ে থাকে। বাকিগুলো কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে, তা তাদের জানা নেই।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যের তীর্থভূমি বান্দরবানে রয়েছে প্রায় ৪৬টি দর্শনীয় স্থান। ছবি: প্রতিনিধি

লামা উপেজলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঈন উদ্দিন বলেন, রিসোর্টগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ দিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রিসোর্ট মালিকদের ট্যুরিজম বোর্ডের অধীনে দুইবার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৗস বলেছেন, বান্দরবানে পর্যটন করপোরেশন বা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আলাদা কোনো স্থানীয় কার্যালয় নেই। ফলে জেলার হোটেল ও রিসোর্ট-সংক্রান্ত বিষয়গুলো জেলা প্রশাসন ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ দেখভাল করছে।

তিনি বলেন, বান্দরবানে বর্তমানে ৭৯টি হোটেল ও রিসোর্ট অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ২০ থেকে ৩০টি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, যেগুলোর মালিকদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার জন্য অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমোদনপত্র নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মালিকদের জানানো হয়েছে।