‘মাথায় রিভলবার ধইরা টাকার কথা বলি নাই’: রাবি শিক্ষককে ‘সর্বহারা’র টেলিফোন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) একাধিক শিক্ষকের কাছে ‘সর্বহারা’ পরিচয়ে কল করে প্রাণনাশের হুমকি ও বিপুল অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছে। সবশেষ, নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহরিয়ার হোসেনের (শাবিন শাহরিয়ার) কাছে ফোন করে জেলে থাকা কর্মীদের জামিনের খরচ চেয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। অধ্যাপক শাহরিয়ার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন,  এ বিষয়ে নিরাপত্তা চেয়ে সম্প্রতি তিনি মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। ‘সর্বহারা পার্টির’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি একাধিকবার টেলিফোনে হুমকি দিয়ে তার কাছে চাঁদা দাবি করেছেন বলেও জানান তিনি।

এ সংক্রান্ত একটি অডিও কল রেকর্ড দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। অধ্যাপক শাহরিয়ার কল রেকর্ডের কথোপকথনের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এতে সর্বহারা নামধারী বক্তা (১) হুমকি দিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে হত্যাকাণ্ড বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের কথা না শোনার ফল। চাঁদা দাবি করে কলদাতা আরও  বলেন, ‘(কর্মীরা) আপনার মাথায় রিভলবার ধইরা বলেন নাই যে, দাদা ফোন করবে, এত লাখ টাকা আপনি ম্যানেজ রাখবেন।’

‘জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করা যায় না’ জানিয়ে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আপনি আমাদের চ্যালেঞ্জ করবেন, না হেল্প করবেন?’ পুরো অভিওটির দৈর্ঘ্য ৫ মিনিট ৪২ সেকেন্ড। 

ভিন্ন একটি সূত্র জানায়, পুলিশ সাইবার ক্রাইম বিভাগের সহায়তা নিলে কলটি মাদারীপুর থেকে করা হয়েছে বলে শনাক্ত হয়। তবে অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে পরবর্তীতে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে—এমন আশঙ্কায় পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে কোনো ভুক্তভোগী শিক্ষক মামলা করছেন না।

ক্যাম্পাসে একের পর এক চাঁদা ও হুমকির ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

 

অধ্যাপক শাহরিয়ারের সাথে চাঁদা দাবিকারীর কথোপকথনের পূর্ণ বিবরণ:

 

  • বক্তা ১: হ্যালো ভাইজান, আপনার জন্য আমি আপনাকে একটু ফোন করেছি। আপনি জানেন যে রাজশাহী বিভাগ বা রাজশাহী ডিভিশনে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের পতন হওয়ার পরে খুলনা বিভাগ এবং রাজশাহী বিভাগে কিন্তু মার্ডারগুলো বেশি হয়েছে। কি কারণ? আমাদের কথা না শোনার কারণে, বা আমাদেরকে সম্মান না করার কারণে।

তা ভাই কে সেরকম মনে করে ফোন করিনি। বা আপনি তো আর কোনো মাল্টিমিলিয়ন এস্টাবলিশড নন, বা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক নন, বা রাজনীতিতে কোনো স্বঘোষিত মন্ত্রী-মিনিস্টার নন। আপনি মানুষ গড়ার কারিগর।

সেই হিসেবে আপনাকে আপনার অলসো ফ্যামিলির রেসপেক্টের সাথে বলব, যে আমাদের বেশ কিছু কর্মীদেরকে ফ্যাসিবাদের যন্ত্রণার সময় ওদেরকে জেলহাজতে রাখা হয়েছে, ওদের জামিনের জন্য ঢাকা মিন্টো রোডের কতিপয় জাস্টিসের সাথে আমাদের একটা ভিডিও কনফারেন্সে একটা গোলটেবিল একটা মিটিং হয়েছে। ওখানে অলরেডি তাদেরকে আমরা ৮৫% টাকা হ্যান্ডওভার করেছি, লাস্ট উইকে দেওয়া সামথিং ৪৫ লক্ষ টাকা আমাদের বাকি।

আমি ভাইকে বলব, আপনি আমাদের পাঁচটা ছেলের জামিনের জন্য যে অর্থটুকু আছে, সেই অর্থটুকু জীবন ওয়ান মোড়, আপনার একটু সহযোগিতা সহানুভূতি করতে হবে। সেই সুবাদে আমরা একটু আপনাকে ডাক দিয়েছি। তা যে ব্রাদার ভাই হিসেবে আমরা আপনার কাছ থেকে কি আশাবাদী হতে পারি?

  • বক্তা ২: এটা কি বলেন! আমি তো নিজেই লোনগ্রস্ত, আমি কোথা—কীভাবে দিব আপনাকে?
  • বক্তা ১: একটা কথা বলি দাদা, আপনি কি লোনগ্রস্ত সেটা আপনার প্রয়োজনে করেছেন। বা ল্যান্ড প্রপার্টির জন্য করেছেন। তা সেটা আপনার প্রয়োজন। আর কারণ আমি বলিনি যে আপনি সেই প্রয়োজনীয় লোন করে আপনি আমাদেরকে হেল্প করেন। আমরা আপনাকে ফোন দিয়েছি, যদি আমরা আপসের মাধ্যমে আপনার কাছ থেকে হেল্প পাই, এজ ওকে আমরা মেনে নিব।

কিন্তু দাদা আপনারও রাস্তায় মুভিং করতে হয়, আপনার সন্তান-সন্ততি ধরে শিক্ষা, রাস্তায় মুভিং করতে হয়। কারণ বোনের প্রশ্ন আচার ব্যবহারের মাঝে বন্ধ হয়ে থাকবে।

কিন্তু দাদা বলছি, ভাই বলছি, ভাই হিসেবে আপনি কতটুকু করবেন, আপনার সাধ্য থেকে সেটা বলবেন। আর আমি যদি আপনাকে কোনো অ্যামাউন্ট বলি, সেটা কিন্তু দাদা আপনার জন্য বার্ডেন হবে।

আপনি ইচ্ছা করলে দেশের পুলিশ, প্রশাসন, র‍্যাব, ডিবি, গোয়েন্দা নিয়ে আপনি চ্যালেঞ্জ করে ফোন রাখবেন। আর আমাদের চলার ক্ষমতা থাকলে আপনার কাছ থেকে আমরা নিব। তো এজন্য একটা কথা বলব, জলে বাস করে কখনো কুমিরের সাথে লড়াই করা যায় না।

ভাই ডাক দিয়েছি, ভাই হিসেবে আমরা আপনার কাছ থেকে কি আশাবাদী হতে পারি? জীবন ওয়ান মোড়। আমরা আপনাকে বলিনি যে আপনি আমাদের মাসে, বছরে, সপ্তাহে অনার করেন। জীবনে একবার আমরা আপনার কাছে হেল্প চেয়েছি, কি আশাবাদী হতে পারি বলুন? শাহরিয়ার সাহেব।

  • বক্তা ২: আমি তো এই মুহূর্তে খুব ইয়েই হয়ে গেলাম, হতাশাগ্রস্ত হয়ে গেলাম।
  • বক্তা ১: ভাই, হতাশাগ্রস্ত তো কোনো হন নাই। কারণ আমরা আপনার বাসায় লেটার নিয়ে কর্মীদের পাঠাইয়া রাতে আঁধারে ঘুমাইয়া আছেন, আপনার মাথায় রিভলবার ধইরা বলেন নাই যে, দাদা ফোন করবে, এত লাখ টাকা আপনি ম্যানেজ রাখবেন। এটা কিন্তু এখনও আপনার সাথে করি নাই।

কিন্তু সেটা আমাদের করতে না হয় সেদিকে ফলো রেখে, আপনাকে—আপনার কাছে আমরা হেল্প চেয়েছি। আপনার সাধ্য কি আছে আপনিও জানেন, আমরাও জানি। কিন্তু আমরা মাউথ থেকে বললে আপনার জন্য বার্ডেন হবে। আপনি বলবেন যে দাদা, বলছি—আমি আপনাকে এতটুকু অনার করব। জীবন ওয়ান মোড়।

  • বক্তা ২: আপনি কোন প্রক্রিয়ায় এটি নিতে চান?
  • বক্তা ১: জ্বি, জ্বি?
  • বক্তা ২: আপনি সাহায্যটা কীভাবে নিতে চান?
  • বক্তা ১: আমি সাহায্যটা কীভাবে নিব, সেটা তো আমি আপনাকে বলি নাই। আপনি যদি মনে করেন আপনি টেবিলে বসে দিবেন, এজ ওকে সেটা একসেপ্ট করব। যদি বলেন যে দাদা, আমাকে কোনো এজেন্ট ব্ল্যাঙ্ক আনবেন না, আমি যেভাবে ভালো হয় আমার নম্বরে বলে দিবেন, সেই ব্যবস্থা করব। সেটাও আপনাকে করে দিব, বলব। তবে আপনি কত করবেন, আপনি সেটা আমাকে বলেন।
  • বক্তা ২: এই মুহূর্তে আমি কোথায় আছি, তা আপনি জানেন?
  • বক্তা ১: আপনি এই মুহূর্তে কোথায়, মিষ্টির দোকানে আছেন নাকি? নাকি তারেক জিয়ার সামনে বসে আছেন? কোনটা, বলেন?
  • বক্তা ২: আমি বলব কেন? আপনি জানেন কি না, সেটা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি।
  • বক্তা ১: আমি না জেনে কি আপনাকে ফোনটা দিয়েছি জনাব? আপনাকে এটা মনে করেছেন যে, আপনার বিষয়টা না জেনে আমরা আপনাকে ফোন দিয়েছি?
  • বক্তা ২: তাহলে একটু কাইন্ডলি বলেন যে আমি কোথায় আছি?
  • বক্তা ১: আপনি কোথায় আছেন এটা এখন যদি আমার বলতে হয়... আপনি তো নাট্যকলা বিভাগে আছেন রাজশাহীতে। আর কী বলব আপনাকে?
  • বক্তা ২: হ্যাঁ, এটা তো আমার পেশা।
  • বক্তা ১: হ্যাঁ, এটা আপনার পেশা। তো আপনার পেশাতেই আপনাকে ফোন দিয়েছি। বুঝতে পারছেন?
  • বক্তা ২: হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।
  • বক্তা ১: তো যদি সেটা বুঝেন, তাহলে ওখানে বলব যে দাদা, আমাদেরকে হেল্প করার ইচ্ছা আপনার আছে না আমাদের সাথে চ্যালেঞ্জ করবেন আপনি, কোনটা?
  • বক্তা ২: না না, চ্যালেঞ্জ করার...
  • বক্তা ১: হ্যাঁ, তো যদি চ্যালেঞ্জ করার কিছু না থাকে, তাহলে আপনার কাছে সহযোগিতা চেয়েছি এখন আপনি কতটুকু করবেন, আপনি সেটা বলেন।
  • বক্তা ২: আমাকে আরেকটু সময় দেন।
  • বক্তা ১: দাদা, আপনাকে এখানে কিন্তু লং টাইম সময় দেওয়া হয়েছে। আপনি বলছিলেন যে আমাকে এক ঘণ্টা পরে একটু ফোন দেন। আমি আপনাকে এক ঘণ্টা পরে তো ফোন দিইনি।
  • বক্তা ২: তখন তো আমি পরীক্ষার কাজ করছিলাম, সেটা তো বললাম আপনাকে।
  • বক্তা ১: এখন যদি হেল্প করার ইচ্ছা থাকে, আপনি বলেন ফোনটা কানে রেখে যে দাদা এইটা দিব। গ্রহণযোগ্য হলে গ্রহণ করব, গ্রহণযোগ্য না হলে...
  • বক্তা ২: না, এখন আমি বলতে পারছি না, আমাকে একটু সময় দিতে হবে।
  • বক্তা ১: কিরকম সময়?
  • বক্তা ২: সেটা জানি না। আমি একটু সময় নিই। তো এত সহজ নয় যে আমি হুট করে... আমি তো শিক্ষক মানুষ। আমার পকেটে সবসময় টাকা থাকে না। আমি তো ওই কী বলা যায়, দিন আনি দিন খাওয়ার মতো অবস্থা। তো এটা কীভাবে আপনাকে দিতে হবে, সেটা আমি একটু ভাবি।
  • বক্তা ১: না না না, আপনি কী যেন বললেন যে এত সহজ নয়, কথাটা যেন কী বললেন ভাইজান? কথাটা আমি আসলে আপনার ভাষাটা আমি বুঝিনি।
  • বক্তা ২: ভাষা আপনি ঠিক বোঝেন। আপনি খুবই ভালো বোঝেন, না বোঝার কিছু নেই। আমাকে সময় দিন, আমি একটু ভেবে আবার পরে আপনাকে—আপনি আমাকে ফোন দিয়েন, তারপরে আমি আপনাকে... আপনি কীভাবে নিতে চান সেটা বলেন। আর সেই মধ্যস্থতাও পরে হবে। ঠিক আছে? ভালো থাকবেন।
  • বক্তা ১: না, কিভাবে দাদা... না না, কীভাবে দাদা কথা... (শেষ)