কিডনি প্রতিস্থাপনসহ চিকিৎসাখাতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

চীনের ইউনান প্রদেশের প্রাদেশিক সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এবং কুনমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেছে। তিন দিনব্যাপী বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সভা ও কর্মশালার অংশ হিসেবে তারা বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে। এ সময় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনা প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) স্থায়ী কমিটির সদস্য ঝাও জুনমিন বক্তব্য দেন। তিনি বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যখাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ঝাও জুনমিন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে চীনের অর্জন ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে বিনিময়ের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে এবং এর মাধ্যমে উভয় দেশের জনগণ উপকৃত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

কুনমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউ কিয়াং তাঁর বক্তব্যে কুনমিং বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই সমঝোতা স্মারক দুই প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

এর মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়সহ বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রমে পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র ও পরিধি আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদও বক্তব্য দেন। তিনি বাংলাদেশের উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসক প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলাম বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এবং দেশের সাম্প্রতিক চিকিৎসা অগ্রগতি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা দেন।

উপস্থাপনায় তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসক প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জটিল ও জটিলতর রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীরা এখানে আসেন। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট চিকিৎসা শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রশিক্ষণ, ক্লিনিক্যাল গবেষণা এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশেও বিশ্ববিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাম্প্রতিক অগ্রগতির বিভিন্ন দিকও উপস্থাপনায় তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে জটিল ও বিশেষায়িত রোগের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, মিনিমালি ইনভেসিভ সার্জারি, আধুনিক রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি এবং উন্নত চিকিৎসাসেবায় বাংলাদেশের সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতির বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা ও পরিধি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। উন্নত সার্জিক্যাল পদ্ধতি, মাল্টিডিসিপ্লিনারি ট্রান্সপ্ল্যান্ট কেয়ার, আধুনিক ইমিউনোসাপ্রেশন এবং অপারেশন-পূর্ব ও অপারেশন-পরবর্তী চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির ফলে বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেবার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্টের পাশাপাশি ইউরোলজিতে মিনিমালি ইনভেসিভ প্রোসিডিউর, এন্ডোইউরোলজি, ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি এবং আধুনিক সার্জিক্যাল ইন্টারভেনশনের ব্যবহার বেড়েছে। দক্ষ জনবল তৈরি, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময় এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়ের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে চিকিৎসা শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রশিক্ষণ, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট, আধুনিক সার্জিক্যাল প্রযুক্তি, চিকিৎসা গবেষণা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তিতে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম।

বৈঠকে উভয় পক্ষ চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।