দেশের বিভিন্ন এলাকায় দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাকে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পাশাপাশি এসব ঘটনায় জবাবদিহিসহ দলের আত্মশুদ্ধি অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মধ্যরাতে পুলিশের উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সহিংস লুটপাট, ভাঙচুর, দখল; কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে টিআইবি।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে শতশত মানুষের সামনে অর্ধশত বছর ধরে গরিব-অসহায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ক্ষমতাসীন দল কোন ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে?’ তিনি বলেন, ‘রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক নির্বাচনের জনরায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের নেতাকর্মীদের এ জাতীয় কর্মকা- দেশবাসীর কাছে কী বার্তা দিচ্ছে?’ সাধারণ জনগণের মানসপটে বিগত সময়ের কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারী আচরণ এখনো সতেজ বলে উল্লেখ করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা দলীয় নেতাকর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশের চলমান দখলবাজি ও চাঁদাবাজির পরিণতি ভেবে দেখছেন কী?’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্রের পতনের পর বিজয়ের দাবিদার হিসেবে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে সারা দেশে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তৃণমূলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দলটির অনেক নেতাকর্মী বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন, যা গণমাধ্যম, পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী সরকারের পতনের পরপরই ঢাকার সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলীর মতো, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনাসহ দেশের প্রধান প্রধান বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, হাটবাজার, ক্যাবল সংযোগ ও ইন্টারনেট, বর্জ্য সংগ্রহ সংক্রান্ত ব্যবসা এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অনুরূপ চাঁদাবাজি ও দখলবাজির হাতবদলকে বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশ মহোৎসবে পরিণত করেছেন, যা কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ঘাত অনেক ক্ষেত্রে নির্লজ্জভাবে সহিংস রূপ ধারণ করছে।’
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘দৈনিক, মাসিক ও এককালীন চাঁদাবাজির এই অপতৎপরতা শুধু চলমান থাকেনি, বরং সরকারের একজন মন্ত্রী যখন ‘চাঁদাবাজি দুর্নীতি নয়, সমঝোতার লেনদেন’ বলে একাধিকবার ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে তার এই অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি অধিকতর স্বাভাবিকতা লাভ করায় এসব ঘটনা ঘটছে, যা সরকারের জন্য অশনি সংকেত।’
তিনি বলেন, ‘ক্ষেত্রবিশেষে দলীয় নেতাকর্মীদের এ ধরনের অপতৎপরতায় উচ্চপর্যায় থেকে বিব্রতবোধ থেকে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও একদিকে কঠোরতর প্রতিরোধমূলক কৌশলের ঘাটতি ও অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের এসব কর্মকা-ে জড়িতদের মূলত সরকারি দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বরং বাস্তবে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটছে, যার বহুমুখী দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।’