চুড়ির রঙে রঙিন জীবন

মেলার অস্থায়ী দোকানে সাদা কাপড়ের ওপর সারি সারি করে সাজানো নানা রঙের চুড়ি। রঙিন পাথর, পুঁতি ও বিভিন্ন কারুকাজে তৈরি চুড়িগুলো কৃত্রিম আলোয় ঝলমল করছে। দোকানের এক পাশে ঝুলছে সাদা পাথর, রঙিন পুঁতি ও লাল সুতায় তৈরি বিভিন্ন নকশার মালা। পাশে রাখা রঙিন পুঁতির চুড়ির বান্ডিল। পেছনে কার্টন ও ব্যাগে আছে মালপত্র। এসবের মাঝখানে পা ভাঁজ করে বসে আছেন আমেনা বেগম। ডেমরার কোনাপাড়ার মাসব্যাপী মেলায় দেখা মেলে ৬৫ বছর বয়সী আমেনা বেগমের।

আমেনা বেগম প্রায় দুই দশক নিজেদের তৈরি চুড়ি-মালার ব্যবসা করছেন, অন্য নারীদেরও আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। ব্যবসা করে সংসারে অর্থের জোগান দিচ্ছেন। তার তৈরি পণ্যের মধ্যে রয়েছে পুঁতির মালা, পাথরের ছোট-বড় মালা, বিভিন্ন আকারের চুড়িসহ নানা ধরনের সামগ্রী।

এক সময় নিজের হাতেই এসব চুড়ি-মালা তৈরি করলেও এখন বয়স বেড়েছে, আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তবে আশপাশের নারীদের শিখিয়েছেন কীভাবে এসব চুড়ি-মালা তৈরি করতে হয়। এখন তাদের মাধ্যমে এসব তৈরি করিয়ে বিক্রি করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘মালা গাঁথার মালামাল কিনা দেই তাগো, ওরাই বানাই দেয়। চুড়ি-মালা এগুলো একটা বানাই দিলে ১০ টাকা করে দেই।’ তিনি জানান,প্রয়োজনীয় উপকরণ পাথর, পুঁতিসহ মালা-চুড়ি তৈরির কাঁচামাল কিনে আনেন পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে।

আমেনা বসবাস করেন রাজধানীর ডেমরার চনপাড়া বস্তিতে। ডেমরার বিভিন্ন হাট-বাজার ও মেলায় চুড়ি-মালা বিক্রি করেন। নিজের কোনো স্থায়ী দোকান নেই। যেখানে মেলা, সেখানেই অস্থায়ীভাবে পসরা সাজিয়ে বসেন।

কত জন নারী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত জানতে চাইলে আমেনা বেগম বলেন, সংখ্যা নির্দিষ্ট নেই। সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো পাঁচ থেকে ছয়জন, আবার কখনো এর চেয়েও বেশি নারী তার কাজ করে দেন। তারা নিজেদের বাড়িতে বসেই চুড়ি-মালা তৈরি করেন। এই ব্যবসার জন্য কোনো বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ বা সহায়তা পাননি আমেনা। প্রবাসী ছেলে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের যৌথ অর্থায়নে চলে তাদের ব্যবসা।

আমেনার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। এক ছেলে প্রবাসী। আরেক ছেলে বস্তির একটি স্কুলে পড়ান। দুই মেয়ের বিয়ে হলেও তারা পাশাপাশি থাকেন। স্বামী, ননদ, নাতি-নাতনিসহ ১৪ জনের পরিবার। সবাই একসঙ্গে থাকেন। পরিবারের অন্য নারীরাও তার কাজে সহযোগিতা করে থাকেন।

বর্তমানে ডেমরার কোনাপাড়া এলাকার ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিত মেলায় নিজের তৈরি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন আমেনা বেগম। বিকেল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলায় থাকেন। তিনি জানান, ছুটির দিনগুলোতে এ মেলায় মানুষের ভিড় বেশি থাকে। অন্য দিনের চেয়ে ছুটির দিনে বিক্রিও ভালো হয়। তবে তার মতে, মেলায় বেশি ভিড় মানেই ভালো ব্যবসা নয়। আমেনা বেগম বলেন, ‘লোকজন বেশি থাকলে সন্ধ্যাবেলায় জিনিসপত্র চুরি হইয়া যায় গা। একসাথে চারজনে দেহে, দুইজনে নেয় কতক্ষণ দেহন যায়।’ এই মেলা এক মাস চলবে। শেষ হলেই তাকে আবার অন্য জায়গায় গিয়ে বসতে হবে। তখন হয়তো হাটে হাটে যাবেন কিংবা বাড়ির কাছে বসে বিক্রি করবেন। প্রায় দুই দশক এভাবেই চলছে আমেনার চুড়ি-মালার ব্যবসা।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের মতো কষ্ট করতে ইচ্ছা করে না আমেনা বেগমের। তারপরও মেলায় এসে বসেন। তার ভাষায়, ‘এই বয়সে কষ্ট করতে ইচ্ছা করে না, আমার মনের টান খালি মাইয়া দুইডার জন্য। ওই লাইগাই একটু আইসা বসি। সবাই না করে আইতে। এরপরেও আসি। যে মাইয়াডা একটু গরিব ওইডারে কিছু দিয়া দিই। মাইয়াডার হাসি দেখলে ভালো লাগে।’

রঙিন চুড়ির ঝিলিকের আড়ালে লুকিয়ে আছে ৬৫ বছরের আমেনা বেগমের জীবনের গল্প। বয়সের ভারে নিজের হাতে আর চুড়ি-মালা বানাতে পারেন না, তবু থেমে যায়নি তার পথচলা। অন্য নারীদের হাতে কাজ তুলে দিয়ে তাদের ঘরেও জ্বালিয়েছেন আয়ের আলো। মেলার এক কোণে পসরা সাজিয়ে তাই চুড়ি বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে আমেনা যেন ছড়িয়ে দেন বেঁচে থাকার সাহস আর স্বপ্নের রং।