ছাড়পত্র ছাড়াই রিসোর্ট!

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের তীর্থভূমি বান্দরবান। জেলার সাত উপজেলায় অসংখ্য পর্যটন স্পটের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বছরজুড়ে হাজার হাজার পর্যটক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসেন। বিশেষ করে ঈদের লম্বা ছুটি কিংবা সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে দর্শনীয় স্থানগুলো। জেলায় রয়েছে প্রায় ৪৬টি দর্শনীয় স্থান। এসব দর্শনীয় স্থানগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের রাতযাপনের জন্য জেলায় গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারিভাবে অসংখ্য হোটেল-রিসোর্ট।

বান্দরবানের লামা, আলীকদমসহ বিভিন্ন উপজেলায় অনুমোদন ছাড়াই পাহাড় কেটে ও বন ধ্বংস করে অসংখ্য রিসোর্ট গড়ে উঠছে। জেলা প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে এর কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই। এই অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন বিকাশ স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও, পাহাড়ি পরিবেশ, প্রাকৃতিক জলাধার এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছে।

ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে রিসোর্ট : পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে ও ঝিরি-ছড়ার প্রবাহবন্ধকতা সৃষ্টি করে মাটি ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে এসব হোটেল-রিসোর্ট। লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পাহাড় এলাকায় বনাঞ্চল ধ্বংস ও পাহাড় ন্যাড়া করে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৯০টি অবৈধ কটেজ। যার অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে বাঁশ, কাঠ ও ছন।

বাড়ছে পরিবেশ দূষণ : আইনের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা এসব রিসোর্ট বনের পরিবেশের ক্ষতি করছে। হোটেল-রিসোর্ট এলাকায় স্থায়ী ময়লার ভাগাড় নেই। ফলে রিসোর্টে দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ফেলে দেওয়া চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল ফেলে বনসংলগ্ন ঝিরি-ছড়া কিংবা নদীর পানি দূষিত করছেন তারা। এলাকা ও ঝিরি-ছড়ার পানি দূষিত হওয়ায় বনের প্রাণীরা ওসব এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এতে করে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে পশুপাখি ও জীবজন্তু।

লামার ইয়াংছা পাড়ার বাসিন্দা মংচিং মার্মা বলেন, রিসোর্ট থেকে ফেলে দেওয়া নানা বর্জ্য এসে পড়ছে ঝিরি ও ছড়াতে। আমাদের একমাত্র পানির উৎস ঝিরির পানি অনেক দুর্গন্ধ। তবুও রান্না-বান্নাসহ এ পানিই ব্যবহার করতে হচ্ছে আমাদের।

রাবার প্ল্যান্টেশনের নামে জমি ইজারা নিয়ে কটেজ তৈরি : সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সূত্র জানায়, লামার মিরিঞ্জা পাহাড় এলাকার অধিকাংশ জায়গা রাবার প্ল্যান্টেশনের জন্য লিজ নেওয়া। কিন্তু সেখানে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের নামে বন্দোবস্তিকৃত  জায়গায় জুমঘর তৈরির মাধ্যমে পর্যটকদের নজরকারার পর শুরু হয় কটেজ নির্মাণের প্রতিযোগিতা। এরপর থেকে ওই এলাকায় শুরু হয় নামে-বেনামে একের পর এক কটেজ নির্মাণের কাজ। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করে সেখানকার স্থানীয় ম্রো, ত্রিপুরা ও মার্মাদের জায়গাও দখল করা হয়। মিরিঞ্জা ভ্যালি রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন, মিরিঞ্জা পাহাড়ে প্রায় ৮৯টির মতো রিসোর্ট রয়েছে। সে রিসোর্টগুলোর কোনো অনুমোদন নেই।

নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা : লামার মিরিঞ্জাসহ পাহাড়ে সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে  ওঠা পর্যটন স্পটগুলো যেন পদে পদে বিপদের উৎস। অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ছন, কাঠ ও বাঁশ দিয়ে। যেগুলোতে নেই নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নেই কোনো পানির উৎসও। দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসসহ সব ধরনের যান চলাচলের জন্য নেই সড়কপথ। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটির পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে লামার ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা।

পাহাড় ধসে দুর্ঘটনার শঙ্কা : লামা-চকরিয়া সড়কে মিরিঞ্জা পাহাড়সহ উঁচু উঁচু পাহাড়গুলোতে খেয়াল খুশি মত গড়ে উঠেছে অসংখ্য রিসোর্ট। গহিন অরণ্যে গড়ে তোলা এসব রিসোর্ট কিংবা কটেজগুলো কাঠ, বাঁশ, টিন কিংবা ছনসহ অন্যান্য হালকা নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে তৈরি। বেশিরভাগ কটেজেই নেই শক্ত ভিত্তি, রিটেইনিং ওয়াল কিংবা স্থায়ী পিলার। কিছু কটেজ এমন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে সামান্য পাহাড়ধস, অতিবৃষ্টি বা প্রবল বাতাসেই ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা : বান্দরবানের পরিবেশকর্মী প্রিন্স মাহমুদ বলেন, ‘বান্দরবানের রিসোর্টগুলোতে বাঁশ ও কাঠের সিংহভাগই আসছে প্রাকৃতিক বন উজাড় করে। সেখানে এসি, জেনারেটর আর সাউন্ড সিস্টেমের উচ্চশব্দে পশুপাখিরা এলাকা ছাড়ছে আর বর্জ্য মিশছে নদী-নালায়। দিন দিন বাড়তে থাকা এসব রিসোর্টের দূষণ এখনই ঠেকাতে না পারলে, ব্যবসায়ীরা পাহাড়কে গলা টিপে হত্যা করবেন।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণের বান্দরবান চ্যাপ্টারের চেয়ারপারসন জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বড় বড় পাহাড়ের চূড়ায় একের পর এক অনুমোদনহীন ইকো রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া এসব স্থাপনা নির্মাণের ফলে এলাকাটি ভবিষ্যতে বস্তিতে পরিণত হওয়ার এবং পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।’

জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও সাংস্কৃতিক সংকট : পাহাড়ি সংস্কৃতির মেলবন্ধনের আড়ালে অপরিকল্পিত রিসোর্ট ও রাস্তা নির্মাণে পাহাড়-গাছপালা ধ্বংস হওয়ায় বন্যপ্রাণী ও আদিবাসী সংস্কৃতি বিপন্ন।

ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানীয়রা বহিরাগতদের কাছে অল্প জমি বেচায় যত্রতত্র অনিরাপদ রিসোর্ট তৈরি হচ্ছে। সিসি ক্যামেরা বা নৈশপ্রহরীহীন এসব প্রতিষ্ঠান মালিকরা নিজেই চালাচ্ছেন, যা পর্যটন ও নিরাপত্তা উভয়কেই ঝুঁকিতে ফেলছে।

লামা রিসোর্ট মালিক সমিতির এডহক কমিটির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন রফিক বলেন, ‘এখানে মোট কতটি রিসোর্ট বা কটেজ রয়েছে তার হিসাব আমাদের কাছে নেই। এখানে একটা সমিতি থাকলেও কেউ কারোর কথা শুনছে না।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব বলেন, তাদের কাছ থেকে ৩২টি পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েছে। ২০টি কক্ষ বা তার বেশি কক্ষের রিসোর্টের ছাড়পত্র পরিবেশ অধিদপ্তর দিয়ে থাকে।

লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঈন উদ্দিন বলেন, এ উপজেলাসহ আশপাশে ঠিক কতটি রিসোর্ট আছে তার সঠিক হিসাব নেই। তবে আগের চেয়ে কিছুটা কমছে। রিসোর্টগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ দিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। রিসোর্ট মালিকদের ট্যুরিজম বোর্ডের অধীনে দুবার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেছেন, বান্দরবানে পর্যটন করপোরেশন বা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আলাদা কোনো স্থানীয় কার্যালয় বা সেল নেই। ফলে জেলার হোটেল ও রিসোর্ট-সংক্রান্ত বিষয়গুলো জেলা প্রশাসন ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ দেখভাল করে।

তিনি আরও বলেন, বান্দরবানে বর্তমানে ৭৯টি হোটেল ও রিসোর্ট অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ২০ থেকে ৩০টি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, যেগুলোর মালিকদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার জন্য অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমোদনপত্র নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মালিকদের অবহিত করা হয়েছে।