মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ঝড় এবং নৈতিকতার লড়াইয়েই বেশি উত্তপ্ত ছিল উয়েফা নেশনস লিগের এই ম্যাচটি। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে আয়ারল্যান্ডজুড়ে চলা তীব্র নৈতিক চাপ ও বয়কটের ডাকের মুখে ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক বিশাল কনসায়েন্স ব্যাটলে বা বিবেকের লড়াইয়ে। তবে সমস্ত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নাটকীয়তা পেছনে ফেলে হাঙ্গেরির ডেব্রেসনে ফাঁকা স্টেডিয়ামের বিষণ্ণ আবহে ইসরায়েলকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে আইরিশরা।
ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল প্রতিবাদের এক অনন্য আবহ। গাজায় নিরীহ মানুষের ওপর নির্বিচারে প্রাণহানির প্রতিবাদে আইরিশ গোলরক্ষক গ্যাভিন বাজুনু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কথা বলে স্কোয়াড ছেড়ে আগেই দেশে ফিরে যান। এরপর ম্যাচের আগে মাঠেও তার প্রতিফলন দেখা যায় স্পষ্ট। আইরিশ কোচ ও খেলোয়াড়েরা কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন এবং ইসরায়েলি জাতীয় সংগীতের সময় মাঠের সবুজ ঘাসের দিকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন।
প্রি-ম্যাচ ফরমালিটির অংশ হিসেবে রেফারিদের সঙ্গে হাত মেলালেও ইসরায়েলি অধিনায়ক মানোর সলোমন কিংবা অন্য কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে কোনো ধরনের হ্যান্ডশেক বা পেন্ট্যান্ট বিনিময় করেননি আইরিশ অধিনায়ক ডারা ও'শেয়া। স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছিল প্রায় দর্শকশূন্য, যেখানে মাত্র কয়েকজন আইরিশ সমর্থক খেলা উপভোগ করছিলেন।
তবে মাঠের ভেতরের খেলায় এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেয়নি হেইমির হালগ্রিমসনের দল। প্রথমার্ধের ঝোড়ো গতিতে মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল করে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে নেয় আইরিশরা। ম্যাচের ১৩ মিনিটে ডান দিক থেকে জেমস আবাংকুয়ার চমৎকার পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচু শটে বল জালে জড়িয়ে ডেডলক ভাঙেন ট্রয় প্যারোট।
এর ঠিক তিন মিনিট পর জ্যাক ময়লানের দারুণ থ্রু পাস থেকে বক্সে ঢুকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন অ্যাডাম ইডা। আর ২৫ মিনিটে ২৫ গজ দূর থেকে চমৎকার শটে দলের তৃতীয় গোলটি তুলে নেন ইন ফর্ম ফরোয়ার্ড জ্যাক ময়লান। গোল করার পর ময়লান কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে নিজের কালো আর্মব্যান্ড খুলে তাতে চুমু খেয়ে দলের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেন।
ম্যাচ শেষে আইরিশ কোচ হালগ্রিমসন সংবাদ সম্মেলনে দলের এই কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমার কোচিং ক্যারিয়ারের এটি সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন কয়েকটি দিন ছিল। তবে বিষয়টি আমাকে নিয়ে নয়, বরং খেলোয়াড়দের নিয়ে। তারা আজ মাঠে প্রমাণ করেছে আয়ারল্যান্ডের হয়ে খেলাটা তাদের কাছে ঠিক কতটা অর্থবহ। তারা চরম ডিগনিটি বা মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের উপস্থাপন করেছে এবং সত্যিকারের গর্বিত আইরিশদের মতো লড়েছে।’
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ইসরায়েল কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও আইরিশ গোলরক্ষক কাওমিন কেলারের দৃঢ়তায় বড় কোনো বিপদ ঘটেনি। খেলার শেষ দিকে পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠলে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে টুকটাক ধাক্কাধাক্কিও হয়।
এদিকে ম্যাচ শেষে ইসরায়েলি কোচ রান বেন-শিমোন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের দলের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা যে চাপের মুখে ভেঙে পড়েছিলাম, তা বলাই বাহুল্য। আমরা মানসিকভাবে ব্যর্থ হয়েছি, ট্যাকটিক্যালিও ব্যর্থ হয়েছি। তবে মাত্র কয়েক দিন পরেই আমাদের আরেকটি ম্যাচ রয়েছে, যেখানে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের নতুন করে শক্তি খুঁজে নিতে হবে।’
এই উত্তাপের এখানেই শেষ নয়; আগামী ৪ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের ‘হোম’ ভেন্যু সার্বিয়ার বাচকা টপোলায় এই দুই দল আরও একবার একে অপরের মুখোমুখি হবে।