গাছের চারা রোপণেই জোবায়েরের সুখ

জোবায়ের আহম্মেদ খান অপুর কাছে গাছের চারা রোপণ যেন জীবনের আনন্দ। ১৮ বছর ধরে ছড়িয়ে দিয়েছেন হাজারো চারা ও তালবীজ। তার স্বপ্ন নিজের হাতে একটু একটু করে পৃথিবীকে আরও সবুজ করে তোলা। লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

গাছের সঙ্গে তার বন্ধনটা আত্মিক। স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে পড়ার সময় গাছ লাগানো শুরু করেছিলেন। ২০০৮ সালের সেই শুরু থেকে ২০২৬ এই ১৮ বছরে তার হাতে রোপিত চারা ও তালবীজের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। তার লাগানো গাছ এখন কোথাও ছায়া দিচ্ছে, কোথাও ফল-ফুলে ভরে উঠছে। আবার কোথাও দুর্লভ কোনো বৃক্ষের সঙ্গে মানুষের পরিচয়ও ঘটছে তার কল্যাণে। এই নিবেদিতপ্রাণ বৃক্ষপ্রেমীর নাম জোবায়ের আহম্মেদ খান অপু। আইন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত জোবায়েরের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা সদরে।

অনুপ্রেরণা পরিবার থেকেই

জোবায়েরের বৃক্ষপ্রেমের নেপথ্যে তার নানার বড় ভূমিকা। ছোটবেলায় নানাকে গাছ লাগাতে দেখতেন। সেখান থেকেই গাছের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ একসময় নেশা, তারপর ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে। কর্মব্যস্ত মানুষ জোবায়ের। তবু একটু সুযোগ পেলেই ছুটে যান গ্রামে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা, রাস্তার ধারে, পার্ক কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি সুযোগ পেলেই রোপণ করেন গাছ। টাঙ্গাইল, গাজীপুর দিনাজপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় এখন শোভা পাচ্ছে তার লাগানো গাছ। শুধু গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন না জোবায়ের। গাছের যতœও নেন। তার কাছে একটি চারা অনেকটা শিশুর মতো। তার ভাষায়, চারা রোপণ করলেই হয় না, তার যতœ নিতে হয়। যতœ পেলে একদিন সেটিই বড় হয়ে ওঠে।

জোবায়ের জানান, ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার চারা ও তালবীজ রোপণ করেছেন তিনি। এসবের মধ্যে রয়েছে ফলদ, ফুল ও ঔষধি গাছ। প্রায় হারিয়ে যেতে বসা অনেক প্রজাতির গাছও রয়েছে তার লাগানো বৃক্ষের তালিকায়। কলেজজীবনে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী সংগঠন বাঁধনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জোবায়ের। ২০০৮ সালে সংগঠনটির রক্তদাতাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একটি করে গাছের চারা উপহার দিয়েছিলেন তিনি। এরপর নিজেই চারা রোপণের কাজে নেমে পড়েন। টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কয়েকটি ফলদ গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার এই উদ্যোগ। এরপর আর থামেনি গাছ লাগানো। জোবায়েরের লাগানো গাছ রয়েছে টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত কলেজ, সরকারি ঘাটাইল ব্রাহ্মণশাসন কলেজ, গালা বীরসিংহ উচ্চবিদ্যালয়, হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণশাসন এ ইউ উচ্চবিদ্যালয়, ব্রাহ্মণশাসন মহিলা কলেজ, ঘাটাইল মাদ্রাসা ও উইজডম ভ্যালি স্কুলসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। উইজডম ভ্যালি স্কুলের অধ্যক্ষ মো. কামাল হোসেন বলেন, জোবায়ের আমাদের প্রতিষ্ঠানে নাগলিঙ্গম, কনকচাঁপা, উদাল, পলাশসহ বিভিন্ন দুর্লভ প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। গাছগুলো এখন বড় হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এসব গাছের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।’ ঘাটাইলের হেলেনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক তালুকদার জানান, তাদের স্কুল, গ্রামের মসজিদ ও কবরস্থানের পাশে জোবায়ের বিভিন্ন জাতের প্রায় ৫০টি আমগাছের চারা লাগিয়েছেন। গাছগুলো এখন ফল দিচ্ছে।

শিক্ষাজীবন শেষে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে যান জোবায়ের। কিন্তু শহুরে ব্যস্ততা তার বৃক্ষরোপণের পথ আটকাতে পারেনি। ঢাকার ৩০০ ফিট সড়কের পাশে শিমুল, জারুল, নিম, হরীতকী, জাম, ছাতিম, অর্জুনসহ বিভিন্ন জাতের ১ হাজার ৫০০টির বেশি গাছের চারা লাগিয়েছেন তিনি। চাকরি, সংসার ও নানা ব্যস্ততার মধ্যেও গাছ লাগানোর সুযোগ খুঁজে নেন তিনি।

২০১৬ সালে দিনাজপুরে বিয়ে করেন জোবায়ের। এরপর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া-আসার সময়ও সঙ্গে করে চারা নিয়ে যেতে থাকেন। আবার সেখান থেকেও সংগ্রহ করেন বিভিন্ন গাছের চারা। পরে সেগুলো রোপণ করেন বিভিন্ন জায়গায়। দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়কের রামডুবি এলাকায় সড়কের দুই পাশে দুই শতাধিক পলাশ, কাঞ্চন, শিমুল ও ছাতিমের চারা লাগিয়েছেন তিনি। রামডুবি-বীরগাঁও আঞ্চলিক সড়কের দুই পাশে লাগিয়েছেন দুই শতাধিক আমগাছ। চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে রোপণ করেছেন আরও তিন শতাধিক ফল ও ফুলের গাছ।

জোবায়েরের মামার বাড়ি সুনামগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে তার যাতায়াত। সেই সূত্রে এই দুই এলাকাতেও গাছ লাগানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি। গত কয়েক বছরে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল, আদালত চত্বর, আলিয়া মাদ্রাসা ও দলদল চা-বাগান এলাকায় পাঁচ শতাধিক গাছের চারা লাগিয়েছেন। ছাতক উপশহর এলাকায় লাগিয়েছেন দুই শতাধিক শিমুলের চারা। গাছ লাগানোর পাশাপাশি বীজ রোপণেও আগ্রহ রয়েছে জোবায়েরের। জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল রেলপথের পাশে গত ছয় বছরে প্রায় ছয় হাজার তালবীজ রোপণ করেছেন তিনি। সেসব বীজ থেকে রেলপথের বিভিন্ন জায়গায় এখন উঁকি দিচ্ছে তালগাছের চারা। একটি বীজ থেকে একদিন বড় গাছ হবে এই অপেক্ষাটিও যেন জোবায়েরের আনন্দের অংশ।

গাছ লাগাতে খরচ আছে। সেই খরচের একটি অংশ নিজের আয় থেকেই বহন করেন জোবায়ের। নিজেও চারা উৎপাদন করেন। পরিবারের সদস্যরাও তাকে উৎসাহ দেন। জোবায়েরের ছোট ভাই ফোজায়েল আহমেদ খান পরাগ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনিও নিয়মিতভাবে ভাইকে গাছ লাগানোর কাজে আর্থিক সহায়তা করেন।

জোবায়ের বলেন, ‘যখন হাতে টাকা আসে, কিছু চারা কিনে রাখি। নিজেও চারা উৎপাদন করি। পরিবারের সবাই আমাকে এ কাজে উৎসাহ দেন। আমি যত দিন বেঁচে আছি, গাছ লাগিয়ে যাব। কারণ গাছ মানুষের বড় বন্ধু।’ ১৫ হাজার চারা ও তালবীজ সংখ্যাটা হয়তো একদিন আরও বড় হবে। তবে জোবায়েরের কাছে আসল আনন্দ সংখ্যায় নয়। আনন্দটা সেই ছোট্ট চারাটির বেড়ে ওঠায়, নিজের চোখের সামনে তার ছায়া ছড়িয়ে পড়তে দেখায়। আজ যে চারা মাটিতে পুঁতে দিচ্ছেন, হয়তো একদিন তার নিচেই দাঁড়াবে কোনো পথিক, খেলবে কোনো শিশু, কিংবা বসবে ক্লান্ত কোনো মানুষ। জোবায়ের তখন সেখানে থাকবেন কি না, কে জানে! কিন্তু তার লাগানো গাছটি ঠিকই বলে যাবে কেউ একজন একদিন এই পৃথিবীটাকে একটু সবুজ করে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।