দেশেই রোবোটিক সার্জারি

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সার্জারি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন সংযোজন রোগীর জন্য আরও নিরাপদ, কম আঘাতপ্রবণ ও অধিক নিখুঁত চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ওপেন সার্জারি থেকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, ল্যাপারোস্কোপি থেকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারি এ বিবর্তনের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো রোবোটিক সার্জারি।

বাংলাদেশও এখন এই প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। গত আগস্ট মাসে মেডবট টুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবটের সহায়তায় দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় একটি রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি এবং অন্যটি রোবোটিক হিস্টেরেকটমি। অনেকে এটিকে বাংলাদেশে নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি সেবার সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

রোবোটিক সার্জারি আসলে কী?

রোবোটিক সার্জারি এমন একটি উন্নত মিনিমালি ইনভেসিভ বা স্বল্প-অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যেখানে সার্জন একটি কনসোলে বসে বিশেষায়িত যন্ত্র ও ক্যামেরা-সমৃদ্ধ রোবোটিক বাহু নিয়ন্ত্রণ করে জটিল সার্জারি কাজটি সহজে সম্পন্ন করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোবট নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীর অস্ত্রোপচার করে না। রোবোটিক সিস্টেম সার্জনের হাতের নড়াচড়াকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিতভাবে রোগীর শরীরের ভেতরের যন্ত্রে রূপান্তর করে। সাধারণত একটি রোবোটিক সার্জিক্যাল প্ল্যাটফর্মে থাকে সার্জনের কনসোল, রোগীর পাশে থাকে একাধিক রোবোটিক আর্ম, উচ্চ-রেজল্যুশনের থ্রি-ডি ক্যামেরা, সূক্ষ্ম ও বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট, সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিত মুভমেন্ট ও মুভমেন্ট স্কেলিং ব্যবস্থা।

ফলে সার্জন শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে ত্রিমাত্রিক ও বড় করে দেখা অপারেটিভ ফিল্ডে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে পারেন।

রোবোটিক সার্জারি কীভাবে কাজ করে?

প্রথমে রোগীর শরীরে কয়েকটি ছোট ছিদ্র করা হয়। এসব ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট প্রবেশ করানো হয়। রোবোটিক বাহুগুলো রোগীর শরীরের বাইরে অবস্থান করে এবং ভেতরের যন্ত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়ায় সক্ষম। কিছু সিস্টেমে ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত মুভমেন্টের সুবিধা থাকে। একই সঙ্গে হাতের স্বাভাবিক বা সূক্ষ্ম কাঁপুনি সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনা যায়।

রোবোটিক সার্জারির সুবিধা

১. নিখুঁত : রোবোটিক সিস্টেম সার্জনের সূক্ষ্ম নড়াচড়াকে আরও সূক্ষ্মভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। বিশেষ করে শরীরের গভীর, সংকীর্ণ ও জটিল অঞ্চলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. থ্রি-ডি ও প্রশস্ত অপারেশন এরিয়া : রোবোটিক সিস্টেমে সার্জন সাধারণত উচ্চ-রেজল্যুশনের ত্রিমাত্রিক ছবি দেখতে পান। এতে টিস্যুর স্তর, রক্তনালি ও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো শনাক্ত করা সহজ হয়।

৩. ছোট ছিদ্র : বড় কাটাছেঁড়ার পরিবর্তে সাধারণত ছোট ছিদ্র দিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলে সার্জারি পরবর্তী ব্যথা হ্রাস পায়, সংক্রমণ কমে ও ঘা শুকাতে খুবই কম সময় লাগে।

৪. রক্তক্ষরণ হ্রাস : অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাটাছেঁড়া করা সম্ভব হওয়ায় কিছু নির্বাচিত অস্ত্রোপচারে রক্তক্ষরণ কম হয়।

৫. দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরা : রোবোটিক সার্জারির বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীরা দ্রুত হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে দৈনন্দিন কাজে ফিরে আসতে পারে। তবে এটি রোগীর অবস্থা এবং অপারেশনের ধরনের ওপর নির্ভরশীল।

৬. জটিল ও ক্যানসার সার্জারিতে সম্ভাবনা : পেলভিস, প্রোস্টেট, জরায়ু, কোলন-রেকটাম, থোরাসিক সার্জারিসহ সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষেত্রে রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম সার্জনকে অধিক অপারেশন স্থান ও দেখার সুযোগ করে দেয়।

রোবোটিক সার্জারির ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা

রোবোটিক সার্জারি অত্যাধুনিক হলেও ঝুঁকিমুক্ত নয়। রোবোটিক সার্জারিতে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিকল্প সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত টিম প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। রোবোটিক সার্জারি পরিচালনার জন্য দক্ষ সার্জন, সহকারী, অবেদন বিশেষজ্ঞ, নার্সিং ও বায়োমেডিক্যাল টিম তৈরি রাখা প্রয়োজন হতে পারে। শুধু রোবট স্থাপন করলেই নিরাপদ সার্জারি পরিচালনা সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘ ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম, প্রশিক্ষণ, অন্যান্য যন্ত্রপাতি এখনো ব্যয়বহুল; তাই অপারেশনের খরচও বেশি। 

রোবোটিক সার্জারি সার্জন প্রতিস্থাপন নয়, সার্জন সহায়ক। সিদ্ধান্ত নেন সার্জন; রোগীর সমস্যা বোঝেন সার্জন; কখন কোথায় কীভাবে অপারেশন করতে হবে। কোনো জটিলতা দেখা দিলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে এসবের জন্য সার্জনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

রোবোটিক সার্জারি সার্জনদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত করবে। রোবোটিক সার্জারির সাফল্য শুধু কতটি রোবট বাংলাদেশে এসেছে এর ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে কতটা নিরাপদ, দক্ষ ও রোগীবান্ধবভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।