হৃদরোগের ঝুঁকি কমাবে জীবনের কিছু পরিবর্তন

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২০ এএম

বাংলাদেশে  এখন কম বয়সেই বাড়ছে হৃদরোগ। ২৫-৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক ইতিহাসের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের সমস্যা, ধূমপান, স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অনিয়মিত জীবনযাপন এর অন্যতম কারণ। বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের চিফ কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক ডা. লুৎফর রহমান গত রবিবার দুপুরে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, জীবনে কিছু পরিবর্তন আনলেই হৃদরোগের অনেক ঝুঁকি কমে যাবে।

অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, হৃদরোগের ক্ষেত্রে জেনেটিক বা বংশগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এছাড়া ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন (উচ্চ রক্তচাপ), ডিসলিপিডেমিয়া (রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিকতা), ধূমপান এবং স্থূলতার মতো ঝুঁকিও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। পাশাপাশি হতাশা, মানসিক চাপ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক পরিবেশের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং অনিয়মিত জীবনযাপনও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, জন্মগত হৃদরোগের বাইরে পরবর্তী জীবনে খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা করোনারি ধমনির রোগ হতে পারে।

করোনারি আর্টারি হচ্ছে হৃৎপি-ের পেশিতে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি। এসব ধমনিতে চর্বি, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থ জমে সংকোচন বা ব্লক তৈরি হলে হৃৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে এনজাইনা বা বুকে ব্যথা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তিনি বলেন, হৃদরোগের পাশাপাশি মস্তিষ্কের রক্তনালিতেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়ে স্ট্রোক হতে পারে। করোনারি আর্টারি ডিজিজ মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এটি নাম্বার ওয়ান কিলার ডিজিজ। এ বিষয়ে মানুষকে সতর্ক হতে হবে।

সচেতন হলেই অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব জানিয়ে অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনলেই হৃদরোগের অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত চিনি, সফট ড্রিংকস বা কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার কমাতে হবে। রেড মিট বা লাল মাংস এবং অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবারও এড়িয়ে চলতে হবে। এসব খাবারের পরিবর্তে শাকসবজি, সালাদ, মাছ ও পরিমিত স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটা ও নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি ধূমপান সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। কারও পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে সেই পরিবারের সদস্যদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। 

পরিশ্রমে বুকে চাপ এলে পরীক্ষা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী কেউ হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, সাঁতার কাটা কিংবা অন্য কোনো পরিশ্রমের সময় বুকে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করলে তাতে অবহেলা করা যাবে না। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে ইসিজি বা ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (হৃৎপি-ের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমের পরীক্ষা), ইকোকার্ডিওগ্রাম বা ইকো (আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে হৃৎপি-ের গঠন ও কার্যক্রম পরীক্ষা) এবং ইটিটি বা এক্সারসাইজ ট্রেডমিল টেস্ট (হাঁটা বা ব্যায়ামের সময় হৃৎপিণ্ডের কার্যক্রম পরীক্ষা) করা যেতে পারে। এসব পরীক্ষায় সন্দেহ দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী করোনারি এনজিওগ্রাম বা করোনারি সিটি এনজিওগ্রাম করতে হবে বলে পরামর্শ দেন তিনি।

উপসর্গের আগেই শনাক্তের গুরুত্ব প্রদানের পরামর্শ দিয়ে অধ্যপাক লুৎফর রহমান বলেন, পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনির অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। করোনারি সিটি এনজিওগ্রামের মাধ্যমে ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমা বা ক্যালসিফিকেশন এবং অন্যান্য পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে তিনি বলেন, কার ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা প্রয়োজন, তা ব্যক্তির বয়স, ঝুঁকি, উপসর্গ ও পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনা করে চিকিৎসককে নির্ধারণ করতে হবে। হৃদরোগের ঝুঁকি পাওয়া গেলে জীবনযাপন পরিবর্তন, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের ওষুধ বা অন্য কোনো চিকিৎসা প্রয়োজন কি না, সেটিও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।

শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে অভিভাবকদের ভূমিকা রাখতে হবে জানিয়ে অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, শিশুদের ফাস্টফুড খাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ছোটবেলায় যে খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয়, তা অনেক সময় বড় হওয়ার পরও থেকে যায়। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত করতে হবে। বাড়িতে নিয়মিত সফট ড্রিংকস বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় না রাখা বন্ধ করতে হবে। শিশুদের পানি ও স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একইভাবে ধূমপানের অভ্যাস যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়েও পরিবারকে সচেতন হতে হবে।

কখন স্টেন্ট বা কখন বাইপাস করা দরকার এ বিষয়ে অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, হৃদরোগ ধরা পড়ার পর চিকিৎসার ধরন রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এক বা দুটি নির্দিষ্ট ব্লক থাকলে অনেক ক্ষেত্রে এনজিওপ্লাস্টি বা রক্তনালির সংকুচিত অংশ প্রসারিত করার চিকিৎসা এবং স্টেন্টিং বা ধমনির ভেতরে ছোট জালিকাযুক্ত নল বসিয়ে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার চিকিৎসা দরকার। তবে একাধিক ব্লক, লেফট মেইন ব্লক, অস্টিয়াল ব্লক কিংবা এমন কোনো জটিল অবস্থান থাকলে যেখানে স্টেন্টিং উপযুক্ত নয়, সেসব ক্ষেত্রে বাইপাস সার্জারি বিবেচনা করা হয়। বাইপাস সার্জারিকে একটি ‘রিকনস্ট্রাকশন’ বা পুনর্গঠনমূলক চিকিৎসা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সার্জনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, বাইপাস সার্জারিতে শুধু অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করলেই হয় না, কোন জায়গায় গ্রাফট বা বিকল্প রক্তনালি বসানো হবে, কতটি গ্রাফট প্রয়োজন, কোন ধরনের রক্তনালি ব্যবহার করা হবে, তার সংযোগের অবস্থান কেমন হবে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বুকের ধমনি বা ইন্টারনাল ম্যামারি আর্টারি, রেডিয়াল আর্টারি এবং স্যাফেনাস ভেইন বিভিন্ন ধরনের রক্তনালি ব্যবহার করা হয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী কোনটি ব্যবহার করা হবে তা নির্ধারণ করতে হয়। বুকের ধমনি ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি ভালো ফল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে রোগীভেদে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও ডিফিউজ ডিজিজ বা ধমনির বিস্তৃত অংশে রোগ থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিশ্চিত করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।

অধ্যাপক লুৎফর রহমান নারীদের হৃদরোগ নিয়ে নিজের একটি পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি যেসব নারী রোগীদের বাইপাস সার্জারি করেছেন তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী বিধবা ছিলেন। তবে এটিকে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে না দেখে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, মেনোপজ বা মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। এরসঙ্গে সামাজিক ও মানসিক চাপ কিংবা অন্য কোনো শারীরবৃত্তীয় কারণ যুক্ত কি না, তা জানতে গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণায় নারীদের মেনোপজের বয়স, বিধবা হওয়ার সময়কাল, হরমোনের মাত্রা এবং অন্যান্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা দরকার বলে তিনি জানান।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই মূল কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, সবশেষে বলব হৃদরোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপরই গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও হাঁটা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাছাড়া পরিবারের হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে আরও সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। হৃদরোগ প্রতিরোধে ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতার পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন বাড়ানোও জরুরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত