বয়স মেনে ব্যায়াম

হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করতে ব্যায়ামের বিকল্প নেই। বাইপাস-অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, এমনকি হার্ট অ্যাটাকের পরও ব্যায়াম করা যাবে। তবে কখন কোন ব্যায়াম করবেন, কতটুকু করবেন সেটা জানা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে ওজন বেশি হলে। সুগার-প্রেশার-কোলেস্টেরল বেশি থাকা, পরিবারে করোনারি হৃদরোগের ইতিহাস আছে, স্ট্রেসের, ধূমপান-মদ্যপান-ফাস্টফুড খাওয়া, নিয়মিত রাত জাগা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। যাকে বলে সিডেন্টারি লাইফস্টাইল। যে কোনো বয়সে ইস্কিমিক হার্ট ডিজিজ দেখা দিতে পারে।

সিডেন্টারি লাইফ ও ইস্কিমিয়া : দিনে ৮-১০ ঘণ্টা বসে কাজ করা, দেরিতে ঘুমোতে যাওয়া, দেরিতে ঘুম থেকে উঠে, শারীরিক পরিশ্রম কম করা। মূলত আমাদের হার্টের কাজ একটা নির্দিষ্ট গতিতে বাঁধা থাকে মৃদুমন্দ গতিতে বয়ে চলা রক্তে বাহিত হয়ে চর্বিকণা সূক্ষ্ম করোনারি আর্টারিতে যদি জমতে শুরু করে। কখনো তা জমতে জমতে পাহাড় হয়। রক্তনালি সংকুচিত হয়ে পড়ে। বেশি পরিমাণে রক্ত অপ্রশস্ত হৃদ্ ধমনির মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে ধাক্কা খায়। তীব্র ব্যথা যার ফলাফল হার্ট অ্যাটাক। হার্টে ব্লক জানার পরে পুরো মাত্রায় ব্যায়াম শুরু করে দিলেন। একটা সময় করোনারি আর্টারির ব্লক রক্তের চাপে ছিঁড়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।  আবার আপনার উচ্চ রক্তচাপ আছে তারপরও জিমে গিয়ে ভারী ওজন নিয়ে ব্যায়াম শুরু করলেন। এর ফলাফল প্রেশার আরও বেড়ে স্ট্রোক থেকে শুরু করে হার্টঅ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। পেশি বা সন্ধির সমস্যা তো হতেই পারে। কাজেই সমস্যা সমাধান করতে চাইলে ব্যায়ামের অভ্যেস যদি না থাকে, বয়স বেশি হয় এবং হাইপ্রেশার বা হাঁটু-কোমর ব্যথা থাকে তবে বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে জেনে তার পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করতে পারেন।

কোন ধরনের ব্যায়াম : শুরুতে সোজা ধরনের যোগব্যায়াম করতে পারেন। স্ট্রেচিং বা ব্রিদিং এক্সারসাইজ সব সময়ই করতে পারেন। একজন বিশেষজ্ঞের কাছে করলে ব্যথা কমে, ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়ে, মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। হার্ট এবং ফুসফুস ভালো রাখতে প্রয়োজন অ্যারোবিক এক্সারসাইজ। অর্থাৎ হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো,

সাঁতার, খেলাধুলা ইত্যাদি। কাজেই হার্টের সক্ষমতা বাড়াতে নজর দিন অ্যারোবিক্স বা কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়ামের দিকে।

কোন বয়সে কোনটা, কতটুকু : বয়স যদি ৫০ থেকে ৬০ হয়। এই বয়সে ব্যায়াম করেননি। হঠাৎ করে স্কিপিং বা জগিং শুরু করলে এর ফলাফল হার্ট এবং ফুসফুস দুটোতেই সমস্যা তৈরি হতে পারে। কাজেই শুরু করুন হাঁটা দিয়ে। মাঝারি গতিতে হাঁটুন। সুফল পেতে দিনে কম করে আধঘণ্টা হাঁটুন। শুরুতে শরীর তৈরি না থাকলে প্রথম দিকে মিনিট পনেরো হাঁটলেই চলবে। সম্ভব হলে দিনে দু-বার ১৫ মিনিট করে হাঁটুন। একই গতিতে একটানা হাঁটুন। সকালের দিকে হাঁটতে পারলে ভালো। রোদের মধ্যে হাঁটা যাবে না।

শীতের দিনগুলোতে সন্ধ্যাবেলা হাঁটার অভ্যাস করতে পারেন। সপ্তাহে ৫-৬ দিন ৩০-৪০ মিনিট করে হাঁটা অভ্যাস হয়ে গেলে, যদি হাঁটার পর সারা দিন নিজেকে ফিট লাগে, হাঁটার গতি বাড়াতে হবে। যে গতিতে হাঁটলে শীতকালেও অল্প ঘাম হবে, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার দ্রুত হবে, নাড়ির গতি বাড়বে, সেই গতিতে হাঁটুন। হাঁটা বা জগিংয়ের সময় যদি খুব হাঁপিয়ে যান,বেশি ঘাম হতে থাকে, সারা দিন ক্লান্ত-অবসন্ন লাগে, ব্যায়াম কমাতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। হাঁটতে না পারলে হাঁটুতে সমস্যা না থাকলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করুন। কোনোটাই যদি করতে না পারেন তাহলে ঘরে নিজের কাজ নিজেই করুন। অতিতে নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস থাকলে দিনে ২০-৩০ মিনিট জগিং করতে পারেন। দৌড়ানো, সাইক্লিং, সাঁতার, ট্রেডমিল সবই করা যেতে পারে।

ইস্কিমিয়া হলে পরে

ইস্কিমিয়া হয়েছে, নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে, কিছুক্ষণ হাঁটার পরই বুকে কষ্ট হচ্ছে, দোতলার বেশি উঠতে গেলে হাঁপ ধরে। এ রকম হলে হাঁটা কমিয়ে দেওয়া যাবে না।  বরং নিজের সীমাবদ্ধতাকে চিনুন। কতটুকু হাঁটার পর বা কী গতিতে চললে বুকব্যথা হয়, কতখানি সিঁড়ি ভাঙার পর বুকে চাপ ধরে তা খেয়াল করুন। যতটুকু হাঁটলে কষ্ট হয় না ঠিক ততটুকুই হাঁটুন তারপর বিশ্রাম নিন। তারপর আবার হাঁটুন আবার বিশ্রাম নিন। কিছুদিন পরই দেখবেন আপনার হার্ট আগের বেশি সক্ষমতা দিচ্ছে। যে গতিতে হাঁটলে কষ্ট হয় না, সেই গতিতে হাঁটুন। সময়ের সঙ্গে গতি বাড়বে। সিঁড়িতে তাড়াহুড়া করবেন না। ধীরেসুস্থে ভাঙুন। এর বাইরে স্ট্রেচিং, যোগা, মেডিটেশন করতে পারেন। ব্যায়াম করতে চাইলে কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ মতো ট্রেডমিল করতে পারেন।

অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, বাইপাস বা হার্ট অ্যাটাকের পর

অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির পর প্রথম ১-২ সপ্তাহ সাইক্লিং বা পায়ের অন্য কোনো ব্যায়াম, ভারী জিনিস তোলা নিষেধ। তবে হাঁটতে পারবেন আস্তে-ধীরে। প্লাস্টি করে বন্ধ করোনারি ধমনির সব কটা খুলে দিলে ও হার্টের পাম্পিং অ্যাকশন ঠিক থাকলে বয়স এবং শারীরিক সক্ষমতার নিরিখে যা যা ব্যায়াম করা যায় সে সবই করতে পারেন। তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে। বাইপাসের পর কম করে এক-দেড় মাস ডাক্তারের পরামর্শ মতো গ্রেডেড এক্সারসাইজ করুন। ঘরে হালকা পায়চারি, বাড়ির সামনে অল্প হাঁটা, এক তলা সিঁড়ি ওঠানামা, বাইরে বেরোনো এভাবে এগোতে এগোতে একটা সময় আসবে যখন অফিস, মর্নিংওয়াক সবই করতে পারবেন। হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা ঠিক থাকলে এরপর জিম, সাঁতার, ট্রেকিংও করা যাবে। হার্ট অ্যাটাকের পর মাসখানেক গ্রেডেড এক্সারসাইজের পর ব্যায়াম করা যায়। সে ক্ষেত্রে ট্রেডমিল টেস্ট করে হার্টের অবস্থা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেবেন ডাক্তার। হার্টের পাম্পিং অ্যাকশন কমে গেলে সেক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

হার্টের পাম্পিং অ্যাকশন কমলে

যোগা, স্ট্রেচিং, ব্রিদিং এক্সারসাইজ করা অনেকটা সাবধানে। ভারী জিনিস তোলা, ঠেলা বা পরিশ্রমের কাজ করা যাবে না। নিয়ম মেনে হাঁটতে হবে। কারণ তাতে কোল্যাটারাল সার্কুলেশন বাড়বে। হার্টের সমস্যা কমতে শুরু করবে।

 কোল্যাটারাল সার্কুলেশন

মূল করোনারি ধমনিগুলোর পাশাপাশি বেশ কিছু ধমনি থাকে যারা সচরাচর তেমন কোনো কাজ করে না। নিয়মিত পরিমিত ব্যায়াম করলে এরা সচল থাকে। রক্ত সঞ্চালন শুরু হয় এদের মধ্য দিয়ে। যত বেশি কোল্যাটারাল সার্কুলেশন শুরু হয় তত বেশি করে ভালো থাকে হার্ট।

ইনসার্ট

২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস পালিত হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো ‘উড়হ’ঃ গরংং ধ ইবধঃ’ অর্থাৎ ‘একটি হৃদস্পন্দনও উপেক্ষা করো না’। এই ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য হলো হৃদরোগের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো চিনতে শেখা এবং সেগুলো অবহেলা না করা। পাশাপাশি প্রতিদিনের সহজ কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখা।