হৃদরোগ প্রতিরোধে জরুরি সময়মতো চিকিৎসা

হৃদরোগ এখন শুধু বয়স্কদের সমস্যা নয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে কম বয়সেও হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের মতো লক্ষণকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ উপলক্ষে হৃদরোগের ঝুঁকি, সতর্কতার লক্ষণ, প্রতিরোধ এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ডা. শেখ মোহাম্মদ হাছান মামুন।

শুরুতে প্রশ্ন ছিল, বর্তমানে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো কী? জবাবে প্রফেসর মামুন বলেন, হৃদরোগের পেছনে সাধারণত একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন ও পারিবারিক ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। এর সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং অপর্যাপ্ত ঘুমও হৃদস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর জানতে চাওয়া হয়, হৃদরোগের কোন লক্ষণগুলোকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়? তিনি বলেন, বুকে চাপ, ভারী অনুভূতি বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম, মাথা ঘোরা, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা বুকের ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে বুকে ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বা ঠা-া ঘাম হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। অনেকেই এসব উপসর্গকে গ্যাস বা সাধারণ দুর্বলতা মনে করে অপেক্ষা করেন, যা কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্ন করা হলে জবাবে প্রফেসর মামুন বলেন, হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে হঠাৎ ব্লক তৈরি হলে হৃদপেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ কমে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যত বেশি সময় এই অবস্থা থাকে, হৃদপেশির ক্ষতির আশঙ্কা তত বাড়ে। তাই দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো করোনারি এনজিওগ্রাম ও প্রয়োজন হলে প্রাইমারি পিসিআইয়ের মতো চিকিৎসা রোগীর জীবন রক্ষা এবং হৃদযন্ত্রের ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এরপর প্রশ্ন ছিল কোনো উপসর্গ না থাকলেও কি নিয়মিত হৃদস্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন? তিনি বলেন, সবার একই ধরনের বা একই সময়ে পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। তবে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপানের অভ্যাস কিংবা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে হৃদযন্ত্রের অন্যান্য পরীক্ষা করা যেতে পারে। কারণ কিছু ঝুঁকির কারণ দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে? জানতে চাওয়া হলে প্রফেসর মামুন বলেন, হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত খাবার, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যাদের ইতিমধ্যে হৃদরোগ রয়েছে, তাদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ চালিয়ে যাওয়া জরুরি।

হৃদরোগের রোগীদের জন্য এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে কী ধরনের চিকিৎসাসেবা রয়েছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে হৃদরোগের প্রাথমিক মূল্যায়ন ও রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা, জরুরি ও নিবিড় পরিচর্যা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সার্জিক্যাল চিকিৎসার সমন্বিত ব্যবস্থা রয়েছে। আধুনিক ক্যাথ ল্যাবের মাধ্যমে করোনারি এনজিওগ্রাফি, এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্টিংসহ বিভিন্ন ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি সেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পেসমেকারসহ বিভিন্ন কার্ডিয়াক ডিভাইস ইমপ্লান্টেশন, হার্ট ফেইলিওর ব্যবস্থাপনা এবং সংকটাপন্ন হৃদরোগীর চিকিৎসার সুবিধা রয়েছে। পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি এবং কার্ডিওথোরাসিক অ্যান্ড ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের মাধ্যমে শিশুদের হৃদরোগ থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এমন রোগীর চিকিৎসার সুযোগও রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো একজন হৃদরোগী যেন প্রয়োজন অনুযায়ী একই জায়গায় সমন্বিত চিকিৎসাসেবা পান।