বিজিবির হেফাজত থেকে ভারতীয় চোরাকারবারী, ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার নেপথ্যে কারা?

রাঙামাটির রাজস্থলীর দমদমিয়া এলাকায় সীমান্ত চেকপোস্টে বিজিবির হেফাজত থেকে দুই ভারতীয় চোরাকারবারীকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় শুরু হয়েছে তোলপাড়। একই সঙ্গে এই ঘটনাটি সামনে এনেছে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন। বিজিবির হেফাজতে থাকা বিদেশি নাগরিককে স্থানীয় পাহাড়ি গোষ্ঠী কি নিজেদের ইচ্ছামাফিক ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে? কারা তাদের হেফাজত থেকে সরিয়ে নিতে সেখানে জড়ো হয়েছিল? কেনই বা থানায় নেওয়ার সময় পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠল? আর ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন ছড়িয়ে পড়ল একপাক্ষিক ভিডিও ও বয়ান?

গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ৪১ বিজিবির কাপ্তাই ব্যাটালিয়নের একটি চেকপোস্টে দুই ভারতীয় চোরাকারবারীকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ভারতীয় প্রসাধনী, শাড়িসহ বিভিন্ন চোরাই পণ্য, নেশাজাতীয় দ্রব্য এবং ভারতীয় আধার কার্ড উদ্ধারের কথা জানানো হয়। পরে তাদের রাজস্থলী থানায় নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু থানায় পৌঁছানোর আগেই তৈরি হয় চরম উত্তেজনা।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, একপর্যায়ে পাহাড়ি কুচক্রী মহলের অঙ্গুলী হেলনে নারীসহ স্থানীয় কয়েকজন বিজিবির হেফাজত থেকে আটক ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়ে। এ প্রসঙ্গে প্রশ্নটি সরাসরি আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত—কোনো বাহিনীর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অধিকার কি স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রয়েছে? আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের চোরাচালানে জড়িত থাকা অথবা আটকের প্রক্রিয়ায় কোনো আইনগত ত্রুটি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আদালত রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে, প্রশাসন রয়েছে। অভিযোগ থাকলে সেসব জায়গায় প্রতিকার চাওয়ার সুযোগও রয়েছে।

কিন্তু কোনো অভিযোগের সমাধান হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে দলবদ্ধভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে সেটিকে কোনোভাবেই সাধারণ প্রতিবাদ বলা যাবে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কেউ কি নিজের হাতে বিচার বা হেফাজতের দায়িত্ব তুলে নিতে পারে? বিশেষ করে এখানে আটক ব্যক্তিরা যদি ভারতীয় চোরাকারবারী হন, তাহলে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিদেশি নাগরিক বা চোরাকারবারী আটক হওয়ার ঘটনা শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তাও যুক্ত। পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে—সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা আদালতের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা যেত। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা কাউকে দলবদ্ধভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে সেটিও আইনশৃঙ্খলার জন্য গুরুতর বিষয়। এখানে কোনো রকম ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নতুন করে আরেক বিতর্ক তৈরি করেছে। যেখানে এই ঘটনাকে পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু ভিডিওটি ঠিক কোন মুহূর্ত থেকে শুরু হয়েছে? তার আগে কী ঘটেছিল? কারা প্রথম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল? আটক ব্যক্তিদের হেফাজত থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কেন করা হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে কয়েক সেকেন্ডের একটি দৃশ্যকে পুরো ঘটনার প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা যৌক্তিক, এই প্রশ্নও মোটা দাগে সামনে এসেছে। এছাড়াও নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত বল প্রয়োগ পরিস্থিতির তুলনায় যথাযথ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া সম্ভব। নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেই আটক ব্যক্তিকে হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কখনও বৈধ হতে পারে না বলে একমত সবাই।

এখানে আরেকটি বিষয় বেশ প্রাসঙ্গিক। প্রতিবাদ আর হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া কি এক? কেউ যদি মনে করেন দুই ভারতীয় চোরাকারবারীকে অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছে, তার প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। অভিযোগ জানানোর অধিকার রয়েছে। আইনগত প্রতিকার চাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদের সীমা কোথায় শেষ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোথা থেকে শুরু—এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আটক ব্যক্তিকে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে সেটিকে নিছক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এর সঙ্গে জড়িত স্থানীয় পাহাড়ি কুচক্রী মহলকেও সনাক্ত করতে হবে। কারণ, আজ যদি কোনো আটক ব্যক্তিকে দলবদ্ধভাবে একটি বাহিনীর হেফাজত থেকে সরিয়ে নেওয়া স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আগামী দিনে যেকোনো আইনগত পদক্ষেপই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে।

রাজস্থলীর ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর আরও একটি হলো—ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর প্রবণতা লক্ষণীয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, একটি খণ্ডিত ভিডিও, কয়েকটি পোস্ট কিংবা এক পক্ষের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো ঘটনাকে নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রশ্নবোধক। তবে ঘটনাটির একটি দিক স্পষ্টভাবে আলোচনার দাবি রাখে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো ঘটনার আদালত নয়।

সেখানে সবচেয়ে আগে ছড়িয়ে পড়া বয়ানটিই সত্য, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছে, সেটিই আসল। কে কী বলেছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রমাণ কী বলছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সীমান্তবর্তী একটি সংবেদনশীল এলাকায় এমন ঘটনা যদি যাচাই-বাছাই ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একপাক্ষিক বয়ান তৈরির উপকরণে পরিণত হয়, তাহলে তা স্থানীয় জনগণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়াতে পারে। অতীতেও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাতের বিভিন্ন ঘটনা জনপরিসরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাটিকেও আবেগ বা পরিচয়ভিত্তিক অবস্থানের পরিবর্তে তথ্য, প্রমাণ ও আইনগত প্রক্রিয়ার আলোকে দেখা জরুরি।

রাজস্থলীর এই ঘটনা তাই কয়েকটি সরল প্রশ্নের মধ্যে আটকে নেই। এর পেছনে আরও বড় প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় একটি ঘটনার প্রভাব ঘটনাস্থলেই থেমে থাকে না। একটি সংঘর্ষ থেকে তৈরি হতে পারে অবিশ্বাস, একটি খণ্ডিত ভিডিও থেকে তৈরি হতে পারে একপাক্ষিক জনমত, আর একটি ভুল বয়ান থেকে বাড়তে পারে নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের দূরত্ব। তাই রাজস্থলীর ঘটনায় এখন সবচেয়ে প্রয়োজন কোনো পক্ষের পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড়ানো নয়; বরং পুরো ঘটনাটির প্রতিটি ধাপ খুঁজে দেখা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেমন জবাবদিহি প্রয়োজন, তেমনি তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও কোনোভাবেই উৎসাহিত করা উচিত নয়। একটি ঘটনার আংশিক দৃশ্য দিয়ে পুরো ঘটনার বিচার না করে প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, কেন উত্তেজনা সৃষ্টি হলো এবং পরবর্তীতে কীভাবে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থাপিত হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থার প্রয়োজন। সেই আস্থাকে দুর্বল করে এমন কোনো ঘটনাই—তা নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ হোক কিংবা স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া—উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম