ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে, বাজেট ঘিরে বাড়ছে চাপ

ফ্রান্সে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন আর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষক ও কর্মী সংকট, অতিরিক্ত ক্লাস, শ্রেণিকক্ষে চাপ এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেশজুড়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে। একই দিনে সরকারি খাতের কর্মীদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি মিলে যাওয়ায় সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ আরও বেড়েছে।

আন্দোলনের সূত্রপাত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের সাঁ-এক্সুপেরি উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানে শিক্ষক পদ পূরণ না হওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রকাশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর তা প্যারিস অঞ্চল ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো পর্যাপ্ত শিক্ষক ও কর্মী নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষের চাপ কমানো, বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কার এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বাড়তি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছে। আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ১৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরোধ বা অবরোধের চেষ্টার আওতায় আসে। ওই দিন ১৬৪ জনকে আটক করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীদের মধ্যেও আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কয়েকটি বিদ্যালয়ের সামনে অগ্নিসংযোগ, বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

আজ মঙ্গলবার আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে ৩৩০টির বেশি উচ্চবিদ্যালয়ে কোনো না কোনোভাবে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির প্রভাব পড়েছে। একই দিনে সরকারি খাতের কর্মীরাও সরকারের ২০২৭ সালের বাজেট পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ধর্মঘট ও বিক্ষোভে অংশ নেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে সরকারের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির দূরত্বও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লকুরনু বলেছেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করা প্রয়োজন। তবে অবরোধ, সহিংসতা ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি মেনে নেওয়া হবে না বলে তিনি সতর্ক করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ল্য ফ্রঁস ইনসুমিজের কয়েকজন নেতা আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে জঁ-লুক মেলেনশো সরকারের প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ নিয়ে সরকার ও ল্য ফ্রঁস ইনসুমিজের মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

তবে আন্দোলনের রাজনৈতিক দিকের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রের বাস্তব সমস্যাগুলোও সামনে এসেছে। শিক্ষক ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, বিদ্যালয়ের ভবনের অবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও শিক্ষার্থীদের কিছু দাবিকে বৈধ বলে স্বীকার করেছে, যদিও সহিংসতার ঘটনায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।

এরই মধ্যে ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন বিরোধী দল ও শ্রমিক সংগঠনের মতবিরোধ বাড়ছে। সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা, সরকারি কর্মীদের বেতন স্থগিত রাখার প্রস্তাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন করে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে।

ফলে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ এখন শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট বা শ্রেণিকক্ষের সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। শিক্ষা, সরকারি ব্যয়, কর্মীদের আয়, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের বাজেট পরিকল্পনা নিয়ে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের সঙ্গে আন্দোলনটির যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে সরকার কীভাবে শিক্ষার্থীদের দাবির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ও বাজেটের চাপ সামাল দেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।