জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বেতন বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার মান উন্নয়নের দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে আন্দোলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) এসব কর্মসূচিতে শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের সমর্থকেরা অংশ নেয়। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
গত ১৭ অক্টোবরের আন্দোলনে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থান নেয় প্রশাসন। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের ঘোষণার ভিত্তিতে শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারম মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এর আগে সপ্তাহের আন্দোলনে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন প্রায় ৬০ হাজার সদস্য।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও বাসাভাড়ার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে বেতন বৃদ্ধি, ন্যূনতম মজুরি ও পেনশন পুনর্মূল্যায়ন, সামাজিক সহায়তা বাড়ানো এবং সরকারি পরিষেবায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, শুধু বেতন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং আয়বৈষম্য কমাতেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে প্রতিবাদ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকস্বল্পতা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির অনিশ্চয়তা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষকস্বল্পতা দূর করা, অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে দ্রুত বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।
পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আবাসনসংকট কমানো এবং শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য দূর করার দাবিও উঠেছে। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর মতে, ভর্তি প্রক্রিয়ার মানদণ্ড আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকার ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
প্যারিসে মিছিলের পথ নিয়ে বিরোধ
রাজধানী প্যারিসে শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মিছিলের অনুমোদিত পথ নিয়ে শ্রমিক সংগঠন ও প্রশাসনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বাস্তিল থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত প্রচলিত পথে মিছিল করার প্রস্তাবের পরিবর্তে প্রশাসন পোর্ত দ্য ভিনসেন থেকে পোর্ত দিতালি পর্যন্ত বিকল্প পথ নির্ধারণ করে। শ্রমিক সংগঠনগুলো এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।
তাদের দাবি, নিরাপত্তার অজুহাতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করা উচিত নয়। মিছিলের পথ নিয়ে বিরোধের জেরে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়। তবে চূড়ান্ত অনুমোদিত পথ ও আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশ যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের বক্তব্য, সম্ভাব্য সংঘর্ষ, দোকানপাটে হামলা ও লুটপাট ঠেকাতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীরা জননিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
দেশজুড়ে শত শত কর্মসূচির পরিকল্পনা
শনিবারের আন্দোলন শুধু প্যারিসে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশজুড়ে সাত শতাধিক কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাধিক মিছিলের উদ্যোগের কথাও প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন শহরের সড়ক, গোলচত্বর, রেলস্টেশন, সেতু, বন্দর ও টোল আদায়ের স্থানে কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে ঘোষিত সব কর্মসূচি বাস্তবে অনুষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু এলাকায় বিক্ষোভ সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়।
লিওঁ শহরে আগের সপ্তাহের আন্দোলনে দেড় শতাধিক দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়। অন্যান্য শহরেও আগের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সতর্কতা জারি করা হয়।
দুপুর পর্যন্ত ১৩৫ জন আটক
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশজুড়ে ১৩৬টি জনসমাগম বা সড়ককেন্দ্রিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পর্যন্ত বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। আগের শনিবার একই সময় পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ হাজার। দুপুর ১টা পর্যন্ত ১৩৫ জনকে আটকের তথ্যও প্রকাশ করা হয়। প্যারিস অঞ্চলে এক হাজারের বেশি তল্লাশি চালানোর কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে এসব সংখ্যা দিনের মধ্যবর্তী সময়ের হিসাব। শনিবারের সব কর্মসূচি শেষে অংশগ্রহণকারী, আটক ব্যক্তি, আহত এবং ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত সংখ্যা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অর্লেয়াঁয় উগ্র ডানপন্থাবিরোধী সমাবেশ
ফ্রান্সের অর্লেয়াঁ শহরেও শনিবার রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দেয়। উগ্র ডানপন্থী দল জাতীয় সমাবেশের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বর্ণবাদ, বৈষম্য ও উগ্র ডানপন্থার বিরোধিতায় একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদমাধ্যমে আয়োজকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ওই সমাবেশে প্রায় ২৬ হাজার মানুষের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। তবে এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা চূড়ান্ত গণনা নয়। অর্লেয়াঁর কর্মসূচিতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থার মতো সামাজিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদও গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ
জীবনযাত্রার ব্যয়, বেতন ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে মানুষের অসন্তোষের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ফরাসি সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের ভর্তি ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোও বেতন, সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি পরিষেবার বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত দাবি করছে।
আগামী দিনগুলোতে সরকারের প্রস্তাব এবং শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর পরবর্তী কর্মসূচি পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২৪ অক্টোবরের আন্দোলনে ফ্রান্সের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অসন্তোষ উঠে এসেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষার মান, বেতন, আবাসন ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে উদ্বেগের সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সিদ্ধান্ত চান আন্দোলনকারীরা।
অন্যদিকে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং জনসাধারণের দাবির বিষয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।