জট খুলতে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারির ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ইরানের গ-ি পেরিয়ে এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে পুরো পশ্চিম এশিয়ায়। সংঘাতের সাত মাস পার হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কার্যত এখনো কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, থমকে থাকা আলোচনায় গতি আনতে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের কর্মকর্তারা। বৈঠকের বিষয়ে অবগত একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই আলোচনায় গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের দেওয়া সাত দিনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের সংশোধিত সংস্করণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পর নিউ ইয়র্কে অবস্থান করা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার শর্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ এ তথ্য জানিয়েছে। আরাগচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি দাবি করে তারা একটি সমঝোতা বা শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়, তাহলে আমরা সেই সমাধানই উপস্থাপন করেছি।’ গত সোমবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা আলাদাভাবে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিক জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাবের আশায় রয়েছে ইরান। আরাগচি বলেন, ‘কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কিছু ধারণা উপস্থাপন করেছে এবং আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। তারা বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আরও একবার আলোচনা করবে, তারপর চূড়ান্ত জবাব আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।’

ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে বলা হয়েছে ইরান ও লেবাননে সব ধরনের সংঘাত বন্ধ করতে হবে, আটকে থাকা শত শত কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে, ইরানি তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং দেশটির বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ তুলে নিতে হবে। এর বিনিময়ে তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে এবং উভয় পক্ষ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু করবে। এর আগে গত এপ্রিল ও জুনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দফা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে উভয় চুক্তিই অল্প সময়ের মধ্যে ভেস্তে যায়। এই সংঘাতে উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে সামরিক-বেসামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

এদিকে, পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড়ের বিনিময়ে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আটকে থাকা তহবিল ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার খবর অস্বীকার করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, খবরটি ‘ভুয়া’। তিনি সেখানে লেখেন, ‘আমি তাদের কিছুই প্রস্তাব করিনি!’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাতে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে জানায়, পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে তেহরানের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিনিময়ে ট্রাম্প ‘ইরানকে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি দিতে এবং দেশটির জব্দ করা তহবিল ছাড় দিতে আগ্রহী’। ট্রাম্প পুরো প্রতিবেদনটিকে ‘একটি ধাপ্পাবাজি’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং সংবাদমাধ্যমটির এ খবর প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।

গালিবাফের হুঁশিয়ারি : ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির প্রতিবেদনে গালিবাফের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, যে অঞ্চলে ইরান তেল বিক্রি করতে পারবে না, সেখানে অন্য কেউও তেল বিক্রি করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশকে সতর্ক করে গালিবাফ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি বা ‘দুঃসাহসিক পদক্ষেপের’ জবাব দ্রুত ও কঠোরভাবে দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ইরানের ওপর নৌঅবরোধ আরোপ, আকাশপথ বন্ধ করা এবং দেশটির বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টির যে চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করছে তা ব্যর্থ হবে।