হাসপাতালের টিকিট থেকে সেতুর টোল, বাংলা কিউআরে জোর

নগদ লেনদেন কমিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

হাসপাতালের টিকিট ও বিভিন্ন ফি পরিশোধ, স্কুলের বেতন, শিক্ষার্থীদের ক্যান্টিনে কেনাকাটা এবং সড়ক ও সেতুর টোল আদায়ে এ পদ্ধতি চালুর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মাধ্যমে দৈনন্দিন ছোট অঙ্কের লেনদেন ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনার পাশাপাশি নগদ টাকা ও ভাংতির সংকট কমাতে চায় সংস্থাটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজ বুধবার বাংলা কিউআর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে আগামী তিন মাসে পর্যায়ক্রমে বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে। এতে লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের তুলনায় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ এবং লেনদেনের অর্থমূল্য বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। বর্তমানে বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্টের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছেছে। সর্বশেষ এক সপ্তাহে এ ব্যবস্থায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা।

আরিফ হোসেন খান বলেন, ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতির প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল তথ্যচিহ্ন তৈরি করা। এতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির লেনদেনও হিসাবের আওতায় আনা সম্ভব হবে। দেশের অর্থনীতির প্রকৃত আকার ও বাজারের ব্যাপ্তি দৃশ্যমান হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার থাকলেও মুদি দোকান, বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ছোট অঙ্কের লেনদেন এখনো নগদনির্ভর। অথচ এসব লেনদেনেও নগদ টাকা ও ভাংতি নিয়ে ভোগান্তি হয়। অনেক সময় ৫০ টাকার নোট দিয়ে ১০ বা ২০ টাকার পণ্য কিনতে গেলে ভাংতি পাওয়া যায় না। পুরোনো ও মলিন নোট নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়। বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়লে এসব সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।

তিন মাসে নতুন পদক্ষেপ: গত ১ জুলাই থেকে সর্বস্তরে বাংলা কিউআর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা চালুর পর বাস্তবায়নের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পর্যবেক্ষণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব বাধা দূর করে ব্যবস্থাটিকে আরও জনপ্রিয় করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে গভর্নরের নেতৃত্বে একটি স্টিয়ারিং কমিটি এবং ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে একটি কার্যকরী কমিটি কাজ করছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

তিনি বলেন, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা দিয়ে এ ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয়। এ কারণে দেশের প্রায় ১৯টি জেলায় বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কাছ থেকেও মতামত নেওয়া হয়েছে। বাংলা কিউআর কীভাবে আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করা যায়, তা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হয়েছে।

আগামীকাল ১ অক্টোবর থেকে কয়েকটি পদক্ষেপ কার্যকর হবে। এ ছাড়া কিছু পদক্ষেপ ১ নভেম্বর থেকে এবং আরও কিছু নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বছরের শেষ নাগাদ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

হাসপাতালের টিকিটেও কিউআর: স্বাস্থ্য খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কেনার মতো ছোট লেনদেনেও এ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। অনেক সময় ১০ টাকার টিকিট কিনতে ৫০ টাকার নোট দিলে ভাংতি পাওয়া যায় না। এতে রোগীদের লাইনে অপেক্ষার সময় বাড়ে। বাংলা কিউআর চালু থাকলে মোবাইল ফোন দিয়ে কোড স্ক্যান করে সরাসরি মূল্য পরিশোধ করা যাবে।

শিক্ষা খাতেও স্কুলের বেতন, শিক্ষার্থীদের ক্যান্টিনে খাবার কেনা এবং পেন্সিল, ইরেজার, শার্পনার ও জ্যামিতি বক্সের মতো শিক্ষা উপকরণ কেনার ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। বেসরকারি স্কুলের বেতন ক্যাশলেস করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব অর্থ পরিশোধে বাংলা কিউআর ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

যোগাযোগ খাতের বিভিন্ন সড়ক ও সেতুর টোল প্লাজায়ও এ পদ্ধতি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন সড়কের টোল প্লাজায় দীর্ঘ লাইনের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, টোল পরিশোধে কিউআর ব্যবহার করা গেলে সময় কমবে। একই সঙ্গে নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমবে এবং টোল আদায়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করা সম্ভব হবে।

চার্জ কমানোয় গুরুত্ব: বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের লেনদেন ফি বা চার্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে উল্লেখ করেন আরিফ হোসেন খান। তাঁর মতে, পণ্য বিক্রির পর প্রাপ্য অর্থ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে রাখা হলে ব্যবসায়ীরা এ পদ্ধতি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। তাই ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনকে সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন সমাধান বের করা হয়েছে।

বাংলা কিউআরের আরেকটি সুবিধা হলো আন্তঃব্যবহারযোগ্যতা। আগে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কিউআর ব্যবহার করলে অন্য প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকেরা অনেক ক্ষেত্রে সেখানে অর্থ পরিশোধ করতে পারতেন না। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে একটি অভিন্ন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও পেমেন্ট সেবার গ্রাহকদের লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, যেসব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সম্পৃক্ততা বেশি, সেসব খাতে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা গেলে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তবে বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নির্দেশনাও প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলা কিউআরকে শুধু অর্থ পরিশোধের একটি মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী তিন মাসে নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দৈনন্দিন ছোট লেনদেনের বড় একটি অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।