গতকাল ৩০ সেপ্টেম্বর দেশে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়েছে। আমরা জানি, সমাজে যাতে নারীরা বৈষম্যের শিকার না হন, এই লক্ষ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর ‘কন্যাশিশুরা নিরাপদ নয়’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সংগতই প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, দিবস পালন কি শুধু আনুষ্ঠানিকতার বৃত্তবন্দি হয়ে আছে? জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দিবস পালন বা উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো, নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। কিন্তু আমরা কি সেই লক্ষ্য পূরণে সাফল্য অর্জন করতে পারছি? উত্তর যে প্রীতিকর নয় এর সাক্ষ্য দিচ্ছে ওই প্রতিবেদনটিই। প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকটি কেসস্টাডি ও অন্যান্য তথ্য সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ কন্যাশিশু দুর্বৃত্তদের পৈশাচিকতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। আমরা দেখছি, শুধু কন্যাশিশুই নয়, কোনো শিশুই সমাজে নিরাপদ নয়।
দূর অতীত বাদ দিলেও, সাম্প্রতিক দেশে কয়েকটি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্র, আইন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার খতিয়ান কতটা দীর্ঘ এরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। অন্যদিকে সমাজ এবং পরিবারও অনেক ক্ষেত্রেই শিশুদের জন্য নিরাপদ কিংবা উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি। এমন প্রেক্ষপটে কন্যাশিশু তো বটেই, লিঙ্গভেদে কেউই নিরাপদ নয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক তথ্যে প্রকাশ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে কমপক্ষে ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর বা ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে ১৭ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আগস্ট মাসে ৩৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয় এবং ১ কন্যাশিশুসহ দুজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে কমপক্ষে ৫ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আরও জানা যায়, দেশে গত ৮ মাসে ৩৬ কন্যাশিশু বিভিন্ন ঘটনায় হত্যার শিকার হয়েছে। সমাজে ক্রমবর্ধমান নানামাত্রিক অপরাধের পরিসর বেড়ে চলার প্রেক্ষাপট কীভাবে তৈরি হচ্ছে তা সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। এর অন্যতম একটি কারণ হলো ‘মব’-এর বিস্তার। সমাজের অনেক কণ্ঠ নীরব হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি একটি সমাজ ও দেশের জন্য কোনোভাবেই শুভ ইঙ্গিতবহ নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিম্নগামিতার মাশুল গুনতে হচ্ছে শিশুদেরও। তা ছাড়া শিশু ও নারী সুরক্ষার পথটি আরও কণ্টকাকীর্ণ করছে ধর্মান্ধদের নেতিবাচক মনোভাব। বাল্যবিয়েসহ অধিকারের প্রশ্নে লিঙ্গভেদে কখনো কখনো এতটাই বৈরী পরিস্থিতির ছায়া প্রলম্বিত হয়, যা আইনের শাসন ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং এর ফলেও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই উল্টো ভিকটিমকে পড়তে হয় বিড়ম্বনার মুখে।
প্রথমত, আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব অপরাধীদের এক ধরনের দায়মুক্তি দেয়। যার ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং নতুন অপরাধে লিপ্ত হতে ভয় পায় না। দ্বিতীয়ত, এখনো আমাদের সমাজের একটি বড় অংশে পিতৃতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব বিদ্যমান, যা নারীকে বা কন্যাশিশুকে দুর্বল ভাবার মানসিকতা তৈরি করে। এর পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহারের জন্য সাইবার জগতেও কন্যাশিশুরা মারাত্মকভাবে বুলিং ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হচ্ছে। যেকোনো শিশুর জন্মেই একটি পরিবারে ও পারিপাশির্^কতায় আনন্দের ঢেউ ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কন্যাশিশুর ভূমিষ্ঠের সংবাদে আনন্দের আরও বাড়তি অনুষঙ্গ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যাদের জন্মে আনন্দ, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কেন এত শঙ্কা, এই প্রশ্ন সভ্যতা-মানবতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। লিঙ্গবৈষম্যের কাদা জল সময়ের স্রোতে কিছুটা হলেও ভেসে গেছে তা অসত্য নয় বটে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নিরাপত্তার জাল সেই স্বচ্ছ জলে কতটা বিস্তৃত হয়েছে? রাষ্ট্র-সমাজ থেকে কন্যাকেন্দ্রিক অবহেলা দূর হবে, নিরসন ঘটবে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের এই প্রত্যাশার অপূর্ণতার দায় দায়িত্বশীল কারোরই এড়ানোর অবকাশ নেই। আমাদের প্রয়োজন কেবল কোনো একটি ঘটনার পর প্রতিবাদ, মিছিল বা শুধু দ্রুত শাস্তির দাবি নয়; জরুরি হলো একটি জাতীয়, দীর্ঘমেয়াদি শিশু সুরক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলা। মনে রাখতে হবে সমন্বিত জাতীয় শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতের বিকল্প নেই।