আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ শুরু হওয়ার পর খেলাপি ঋণের হিসাব দ্রুত বেড়েছে এটি সত্য। কিন্তু বাস্তবে তখন নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি। ঝুঁকিটি আগে থেকেই ছিল; শুধু হিসাবের খাতায় তা দৃশ্যমান ছিল না। অর্থাৎ যা ঘটেছে, তা নতুন ক্ষতি তৈরি হওয়া নয়; বরং ক্ষতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসা। যেকোনো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রথম শর্তই হলো ঝুঁকি সঠিকভাবে মাপতে পারা। সেই অর্থে গত দুই বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো আমরা এখন সমস্যার প্রকৃত আকার সম্পর্কে অনেক বেশি পরিষ্কার ধারণা পাচ্ছি।
সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে কঠিন। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশের ওপরে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এর প্রভাব শুধু ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে সীমাবদ্ধ নেই। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে। এর অর্থ হলো, দেশের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় মূলধন পাচ্ছেন না, কারখানা সম্প্রসারণ থমকে যাচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থানও কমছে। তাই ব্যাংক খাতের সংকট শুধু আর্থিক খাতের সংকট নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। আশার কথা হলো, সমাধানের নকশা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও দেউলিয়া সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়নের কাজ এগোচ্ছে। আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত জুন মাসে বিশ্বব্যাংক ৪৫ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচি অনুমোদন করেছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইটি অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং পুরো খাতের ডেটা ও বিশ্লেষণগত ঘাটতি পূরণে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, দাতা সংস্থাটি অর্থায়নের তালিকায় ডেটা ব্যবস্থাপনাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে চিহ্নিত করেছে। এটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। কারণ, আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হবে ডেটা ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে ব্যাংকগুলোকে প্রত্যাশিত ক্রেডিট লস পদ্ধতিতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান-আইএফআরএস ৯-এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। বিষয়টি শুনতে নিছক হিসাববিজ্ঞানের একটি কারিগরি পরিবর্তন মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চিন্তাধারায় একটি মৌলিক পরিবর্তন। প্রচলিত ব্যবস্থায় ঋণখেলাপি হওয়ার পর ক্ষতি স্বীকার করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় ঋণ দেওয়ার সময় থেকেই সম্ভাব্য ক্ষতির পূর্বাভাস করতে হবে। সেই পূর্বাভাসে বিবেচনায় নিতে হবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, খাতভিত্তিক প্রবণতা এবং গ্রাহকের নিজস্ব আচরণ। অর্থাৎ দৃষ্টিভঙ্গি ঘুরে যাবে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে।
এই রূপান্তরের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ডেটা। প্রত্যাশিত ক্রেডিট লস একটি কার্যকর মডেল তৈরি করতে হলে কয়েক বছরের খেলাপি ঋণ ও আদায়ের ধারাবাহিক ইতিহাস দরকার ডিজিটাল ও কাঠামোবদ্ধ আকারে। আমাদের অনেক ব্যাংকেই এই ইতিহাস হয় অসম্পূর্ণ, নয়তো বিভিন্ন কাগজপত্র ও বিচ্ছিন্ন সিস্টেমে ছড়িয়ে আছে। ফলে প্রকৃত কাজটি হবে অনেকটা নীরব ও পরিশ্রমসাধ্য। পুরনো ঋণ হিসাবের ডেটা ডিজিটাল করা, গ্রাহকের অভিন্ন পরিচিতি নিশ্চিত করা, খেলাপি ও পুনঃতফসিলের সংজ্ঞা সব ব্যাংকে এক করা এবং জামানতের মূল্যায়ন নিয়মিত হালনাগাদ রাখা, এসব কাজ হয়তো আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু বাকি সব সংস্কারের সাফল্য অনেকটাই এর ওপর নির্ভর করবে। এই ভিত্তি তৈরি হলে সুফল শুধু নিয়মকানুন পরিপালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সবচেয়ে বড় লাভ হবে আগাম সতর্কতায়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আর্থিক খাত দ্রুত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মাত্রার নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল), সুশাসনের অভাব দূর করে ও পুরনো আইসিটি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা সফল করতে জরুরি যথাযথ কর্মপরিকল্পনা। ডাটা সায়েন্স আধুনিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অপরিহার্য এক মাধ্যম হয়ে উঠেছে, বিশেষত পূর্বাভাসমূলক বিশ্লেষণ ব্যবসার প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য অন্যতম প্রধান শক্তিও বটে।
একজন গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার আগে সাধারণত কয়েক মাস ধরে নানা ধরনের সংকেত দেখা দেয়। চলতি হিসাবে লেনদেনের ধরন বদলে যায়, আমদানি-রপ্তানির প্রবাহ কমে আসে, কিস্তি পরিশোধের সময় ক্রমে পিছিয়ে যেতে থাকে। এসব ডেটা ব্যাংকের কাছে ইতিমধ্যেই আছে; শুধু ডেটাগুলোকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সেই ব্যবস্থা তৈরি হলে সময়মতো হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হবে। কোনো উদ্যোক্তার ব্যবসা যদি মূলত সচল থাকে, কিন্তু সাময়িক নগদ সংকটে পড়ে, তাহলে তার ঋণ পুনর্গঠন করে দিলে ব্যাংকও টাকা আদায়ের সুযোগ পাবে, প্রতিষ্ঠানটিও টিকে যাবে। কিন্তু ঋণখেলাপি হওয়ার পর একই কাজ করতে গেলে আদায়ের সম্ভাবনা অনেক কমে আসে আর আইনি প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর কেটে যেতে পারে। ডেটার আরেকটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে। আমাদের ঋণব্যবস্থা এখনো মূলত জামানতনির্ভর। ফলে যার জমি বা স্থাবর সম্পত্তি নেই, তিনি ব্যবসা যত ভালোই পরিচালনা করুন না কেন, অনেক সময় ঋণ পান না। অথচ আজ একজন ছোট ব্যবসায়ীর নির্ভরযোগ্য আর্থিক পরিচয় অন্যভাবেও তৈরি করা সম্ভব। মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেনের ইতিহাস, নিয়মিত ইউটিলিটি বিল পরিশোধের রেকর্ড, সরবরাহ শৃঙ্খলে ক্রয়-বিক্রয়ের ধারাবাহিকতা এসব ডেটাও একজন গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। বিশ্বের বহু দেশে এ ধরনের বিকল্প ডেটা ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে ঋণ দেওয়ার কার্যকর মডেল তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে এই সুযোগ কাজে লাগানোর ভিত্তি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে।
একই যুক্তি বীমা খাতের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। বীমা নিয়ন্ত্রক কর্র্তৃপক্ষও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির দিকে এগোচ্ছে এবং গ্রাহকের অভিন্ন পরিচিতি নম্বর চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা সাধারণত ব্যাংক ও বীমাকে আলাদা করে আলোচনা করি। কিন্তু ঝুঁকির দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি খাতই একই সূত্রে বাঁধা। দুই ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্ন এক প্রতিষ্ঠানটি যে দায় নিজের কাঁধে নিচ্ছে, তার প্রকৃত আকার সে কি জানে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে মূলধন সংরক্ষণ যথাযথ হয়, মূল্যনির্ধারণ ন্যায্য হয় এবং সংকটের সময় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ে। উত্তর যদি না হয়, তাহলে সমস্যা নীরবে জমতে থাকে যতক্ষণ না একদিন তা সবার সামনে চলে আসে। প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে একটি নতুন ঝুঁকির কথাও মনে রাখা দরকার। আর্থিক সেবা যত বেশি ডিজিটাল হচ্ছে, সাইবার নিরাপত্তা ও অপারেশনাল ঝুঁকিও তত বাড়ছে। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইটি অবকাঠামো আধুনিকায়নের বিষয়টি সংস্কার কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি যথার্থ পদক্ষেপ। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আধুনিক ধারণায় ঋণঝুঁকি, বাজারঝুঁকি ও অপারেশনাল ঝুঁকিকে আলাদা করে নয়, সমন্বিতভাবে দেখতে হয়। আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
এসবের কোনোটিই মানুষের দক্ষতা ও সম্পৃক্ততা ছাড়া সম্ভব নয়। ঋণঝুঁকি মডেলিং, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স এবং বিজনেস অ্যানালিটিক্সে প্রশিক্ষিত জনবলের চাহিদা আগামী কয়েক বছরে দ্রুত বাড়বে। এখানে একটি আশাব্যঞ্জক দিক আছে দেশের তরুণদের মধ্যে ডেটা অ্যানালিটিক্সে আগ্রহ এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। অনেকেই নিজ উদ্যোগে এই দক্ষতা অর্জন করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বীমা একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি যৌথভাবে বৃত্তি ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করে, তাহলে এই আগ্রহকে আর্থিক খাতের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা কঠিন হবে না। বাংলাদেশের আর্থিক খাত এই মুহূর্তে একটি বিরল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারিত, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কাজ চলছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নও নিশ্চিত হয়েছে। এমন সুযোগ বারবার আসে না। এখন প্রয়োজন ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা বিশেষ করে সেই নীরব কাজগুলোর ক্ষেত্রে, যেগুলো সংবাদ শিরোনাম হয় না, অথচ যার ওপর বাকি সবকিছু দাঁড়িয়ে আছে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল কথাটি খুব সরল এবং ব্যাংক-বীমা নির্বিশেষে সমান সত্য : যে ঝুঁকি সঠিকভাবে মাপা যায়, কেবল তাকেই কার্যকরভাবে সামলানো যায়। গত দুই বছরে আমরা ঝুঁকি মাপতে শিখেছি। এখন সেই ঝুঁকি সামলানোর পালা।
লেখক : গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ফেলিসিয়ানো স্কুল অব বিজনেস মন্টক্লেয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
imamm2@montclair.edu