বিনিয়োগ বাড়াতে ১৮ মাসের পরিকল্পনা সরকারের

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বাড়াতে ১৮ মাসের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। শিগগিরই পরিকল্পনাটি প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। এর মাধ্যমে শুধু ঋণ ও তারল্য সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং আর্থিক খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর এসব তথ্য জানান।

সংবাদ সম্মেলনে, নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতিসংশ্লিষ্ট অন্য দুটি সুদহারও অপরিবর্তিত রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এখনই সুদহার কমানোর সুযোগ সীমিত। আবার বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে সুদহার বাড়ানোরও প্রয়োজন দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী দিনে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

হাবিবুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দেশে প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কতটা পড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাবও পর্যালোচনা করা হবে। এসব বিষয় পর্যবেক্ষণের পর নীতি সুদহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে মুদ্রানীতি কমিটি একমত হয়েছে। এ কারণে আপাতত নীতি সুদহারসহ মুদ্রানীতিসংশ্লিষ্ট তিনটি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

এদিকে উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ১৮ মাসের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে। শিগগিরই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এটি ভাগাভাগি করা হবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেড় বছরের মধ্যে এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে হাবিবুর রহমান বলেন, উদ্যোক্তাদের শুধু ঋণ বা তারল্য সরবরাহ করলেই হবে না। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, উপযুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং অন্যান্য সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকলেও আগস্টে তা কমে ৮ শতাংশে নেমে আসে। তবে মূল্যস্ফীতি আরও কমবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে।

ডেপুটি গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে সরকারের অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমার পথে সামনে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করেই নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হবে, নাকি কমানো বা বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন সময়ে সার্কুলার জারি করে নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগও রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগে প্রত্যাশিত সাড়া তুলনামূলক ধীর বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ কর্মকর্তা।

অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে অনেক উদ্যোক্তা কাক্সিক্ষত মাত্রায় ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। 

প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে ডেপুটি গভর্নর বলেন, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। তাই অর্থনীতির প্রকৃত গতিপ্রকৃতি বুঝতে একাধিক প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধির তথ্য একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোর খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এখন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় নতুন মুদ্রানীতির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি, ঋণপ্রবাহ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য নেওয়া সহায়তা পরিকল্পনার বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে।