ফুটপাতে উচ্ছেদ ঘিরে মিরপুর রণক্ষেত্র

ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান কেন্দ্র করে গতকাল বুধবার রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। অভিযান চলাকালে একটি দোকানে আগুন লাগা কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে হকারদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রণক্ষেত্র হয় পুরো এলাকা। বিকেলের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা এবং ডিএনসিসির প্রশাসক।

প্রত্যক্ষ্যদর্শীরা জানান, উচ্ছেদ চলাকালে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে শর্টসার্কিট থেকে আগুনে বাইতুল কুদ্দুস জামে মসজিদের নিচে থাকা ছয় থেকে সাতটি দোকান পুড়ে যায়। এ ঘটনায় হকার ও ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ভাঙচুর শুরু করেন। একপর্যায়ে হকাররা সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন, একটি এক্সকাভেটর  (ভেকু) ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়লে এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন।

এ ঘটনায় সাংবাদিক, পুলিশ, সিটি করপোরেশনের কর্মী, ব্যবসায়ীসহ অনেকেই আহত হয়েছেন।

তাদের ভাষ্য গতকাল বুধবার দুপুর পৌনে ১২টা থেকে উত্তেজনা চলছিল। তখন পুলিশ কাদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। অন্যদিকে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। পুলিশ সদস্যদের চেয়ে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা সংখ্যায় বেশি ছিল। তাদের ইটপাটকেলের মুখে পুলিশ পিছু হটে।

দোকানিরা জানান, পুড়ে যাওয়া দোকানগুলো মসজিদের সীমানায় নির্মিত। এখানে হাত দিতে বারণ করা সত্ত্বেও দোকানগুলোতে এক্সকাভেটর (ভেকু) চালায় সিটি করপোরেশন। এতে বৈদ্যুতিক লাইনে সমস্যা হয়ে আগুন ধরে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নেভায়।

শরিফ নামে এক দোকানি জানান, তারটিসহ সেখানে পাঁচটি দোকান ছিল। দোকানগুলোয় নারী ও শিশুদের পোশাক, জুতাসহ স্বর্ণালংকার ছিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই ক্ষতির দায় কে নেবে। এ দোকানই আমাদের একমাত্র আয়ের উৎস। আয় বন্ধ করে দিয়ে গেলে, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা কে করবে?

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফারুক মিয়া বলেন, ‘উচ্ছেদ করতে আসা দোকানগুলো ছিল মসজিদের নিচতলায়। এগুলো ভাঙার দরকার ছিল না। এই দোকান উচ্ছেদ করতে গিয়েই আগুন লেগেছে। এই লাইনে সব দোকান ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন।’

সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩-১৪ নম্বরমুখী সড়কে মিরপুর আইডিয়াল স্কুলসংলগ্ন হোপ মার্কেট এলাকার বাইতুল কুদ্দুস জামে মসজিদের নিচে কয়েকটি কাপড়ের দোকান, জুতা-স্যান্ডেল ও কসমেটিকসের দোকান পুড়ে গেছে। আশপাশে ফুটপাতে উচ্ছেদ চালানোর ফলে বাঁশ-কাঠ পড়ে রয়েছে। প্রধান সড়কজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ ও ইটের টুকরো। সড়কের মাঝে পুড়িয়ে দেওয়া সিটি করপোরেশনের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। বিকেলের আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও হকাররাও সরে যান।

‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়’ : ঘটনার পর জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এটি তাদের দুজনেরই নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ এর মধ্যে পড়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তারা।

পরিদর্শনকালে ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত চলাচলের উপযোগী রাখা জরুরি। তবে ফুটপাত ও সড়কে ব্যবসা করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাদের জন্য উপযুক্ত বিকল্প স্থান নির্ধারণ করে সেখানে ব্যবসার সুযোগ দিতে হবে।

ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য আরও বলেন, এ সমস্যার টেকসই ও সমন্বিত সমাধান করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা করে দিতে হবে। সেখানে তারা ব্যবসা করবেন, সিটি করপোরেশন যৌক্তিক হারে ট্যাক্স পাবে; কিন্তু কোনো ধরনের চাঁদাবাজি চলবে না।

মিরপুর এলাকায় সাম্প্রতিক বিভিন্ন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দখলদারি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সবাইকে শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দখলদারি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন, মানবিক ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

পরিদর্শনের আগে এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন ডা. শফিকুর রহমান। নিজের সংসদীয় আসনে অভিযান চালানোর আগে তাকে কিছুই জানানো হয়নি বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন। ওই পোস্টে তিনি বলেন, এ আসনটি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন, যেখানে জনগণ তাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করেছেন। সুতরাং জনগণের সুবিধা-অসুবিধা-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সঙ্গে পরামর্শ করা হলে বিষয়টি হয়তো আরও সমন্বিত ও ভিন্নভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো। এ ক্ষেত্রে সংঘাতের পরিবর্তে বাস্তবতা উপলব্ধি করে এমন একটি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের চলাচলের পথও নির্বিঘœ ও ব্যবহার উপযোগী থাকে। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ।

নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রশাসকের শোডাউন : এদিকে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে ঘটনাস্থলে মিছিল-সেøাগান দিয়ে ‘শোডাউন’ করেছেন। দুপুর ১টার দিকে হোপ মার্কেট এলাকায় যান তিনি। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ফ্যাসিজমের দোসররা পরিকল্পিতভাবে মসজিদে আগুন দিয়ে ও হামলা চালিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। আমি মিরপুরের সন্তান। জন্ম আমার এখানে। কারা কী করে, আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী, জনসেবার দায়িত্ব নিয়েছি।’

নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতায়ই গতকালের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছিল জানিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রশাসক বলেন, ‘নগরবাসীর নির্বিঘেœ চলাচল নিশ্চিতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে রেখেছিল যারা, তারা ও তাদের ইন্ধনে আজ সিটি করপোরেশনের পরিবহন, সাংবাদিকসহ কিছু পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা হয়েছে।’

ডিএনসিসির প্রশাসক বলেন, ‘হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা হবে, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও মামলা হবে। তদন্ত করে তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। অবৈধভাবে কাউকে ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না।  মিরপুরের সাধারণ মানুষ ফুটপাত দখলমুক্ত চায়। ভবিষ্যতে কারও ইন্ধনে ফুটপাত দখলের চেষ্টা করা হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হামলায় আহত সাংবাদিকদের পাশে থাকবেন বলে জানান প্রশাসক। তিনি উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে পুলিশের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শফিকুল ইসলাম।