ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ঢেউ

অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষের ভিড়, শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ এবং অসন্তোষজনক ক্লাসসূচির প্রতিবাদে ফ্রান্সের শত শত স্কুলে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি ও আসন্ন বাজেট নিয়েও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। খবর ডয়চে ভেলের। 

ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৪০০টি স্কুলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে বলে জানা গেছে। তাদের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পড়াশোনার পরিবেশ খারাপ হচ্ছে, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই এবং স্কুলের সময়সূচিও শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। শিক্ষা খাতের এই অসন্তোষের পেছনে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট ঘিরে উদ্বেগও কাজ করছে। রেকর্ড বাজেট ঘাটতি ও ব্যয় সংকোচনের চাপের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। এরই মধ্যে সরকারি খাতের অনেক কর্মীর বেতন স্থগিত রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠায় বুধবার ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চবিদ্যালয়ের আন্দোলন থেকে ৬০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েক ডজন নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ কয়েকটি স্কুলের বাইরে সহিংসতাকে ‘সহিংসতার নতুন মাত্রা’ হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি জানান, বুধবারের সংঘর্ষে ৮৩ জন পুলিশ ও জেনদার্ম আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩২ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীও। তার তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩৫৬টি স্কুল এই বিক্ষোভের প্রভাবের মধ্যে পড়েছে।

নুনেজ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা, ইট-পাথরসহ বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ, সহিংসতা, গালিগালাজ, অগ্নিসংযোগের চেষ্টা এবং ‘নগর সহিংসতার’ মতো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গত সপ্তাহ থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন লাইসি—যা যুক্তরাষ্ট্রের হাইস্কুলের সমতুল্য—অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে কিশোর-কিশোরীরা।

তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী কমানো, পড়াশোনার চাপ কমানো, উন্নতমানের শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং শিক্ষক সংকট দূর করা। রাজধানী প্যারিসকে ঘিরে ইল-দ্য-ফ্রান্স অঞ্চলে এই আন্দোলনের শুরু হলেও পরে তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।

বুধবার সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত শহরগুলোর মধ্যে ছিল প্যারিস, দক্ষিণ-পশ্চিমের বোর্দো, দক্ষিণ-পূর্বের লিয়ঁ এবং উত্তরের লিল। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিলে সংঘর্ষের সময় পুলিশ আবারও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, তরুণদের উদ্বেগ ও দাবিগুলো যৌক্তিক। তবে এসব উদ্বেগ কোনোভাবেই সহিংসতা, পুলিশ, শিক্ষক বা অন্যদের ওপর হামলার কারণ হতে পারে না।

মাদ্রিদে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'উচ্চবিদ্যালয় জ্ঞান ভাগাভাগি ও শিক্ষার জন্য উন্মুক্ত থাকার জায়গা। সেগুলো অবরুদ্ধ করা কিংবা আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়ার জন্য নয়।'

ম্যাক্রোঁ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ—দুজনেই বিক্ষোভের সময় সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। নুনেজ বলেন, কিছু এলাকায় এমন ব্যক্তিদের দেখা গেছে, যারা এক স্কুল থেকে অন্য স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থী ও কিশোরদের উসকে দিয়ে সহিংসতায় জড়ানোর চেষ্টা করেছে।

গত কয়েক দিনে সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিকেরা বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই) এবং দলটির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, মেলঁশোঁর বক্তব্য শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও উসকে দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু মেলঁশোঁর বর্ণবাদের অভিযোগকে ‘অপমানজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার অভিযোগ, মেলঁশোঁ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্ককে ‘জাতিগত রূপ’ দিচ্ছেন এবং এমন সময়ে বিভাজন বাড়াচ্ছেন, যখন একজন দায়িত্বশীল রাজনীতিকের উচিত পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা।