বহুরূপী ঈগল

তিন দিনের তিনটি ঘটনা। প্রথমটি সুন্দরবনের কটকার জামতলী খালে, দ্বিতীয়টি ডাংমারি থেকে লাউডুব যাওয়ার পথে এবং তৃতীয়টি শেরপুর শহরের কাছে একটি পরিত্যক্ত রিসোর্টে।

সুন্দরী হাঁসসহ বিরল ও দুর্লভ কিছু পাখি দেখার প্রত্যয়ে ২০১৪ সালের ১২ মার্চ রাতে সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সকালে মংলা থেকে ছোট্ট লঞ্চ ‘জলপরী’ যাত্রা শুরু করল কটকার উদ্দেশ্যে। রাতে কটকা পৌঁছে পরদিন ভোর সাড়ে ৬টায় লঞ্চের সঙ্গে আনা নৌকায় জামতলী খালে ঢুকলাম। জামতলীর বিভিন্ন খাঁড়িতে ঢুকে লাল মাছরাঙাসহ বেশকিছু প্রজাতির পাখির ছবি তুললাম। এই প্রথম লাল মাছরাঙা দেখলাম। কিন্তু অভিজ্ঞ মাঝি সঙ্গে নিয়ে জায়গামতো গিয়েও সুন্দরী হাঁসের দেখা পেলাম না। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা পর ফিরতি পথে জামতলী খালের পাড়ে একটি কেওড়া গাছের ডালে গাঢ় কালচে-বাদামি রঙের একটি শিকারি পাখিকে বসে থাকতে দেখলাম। এর আগে ২০১২ সালের জুলাইয়ে বাগেরহাটের একটি মাছের ঘেরের এক শ্রমিকের কাছে একই প্রজাতির অল্প বয়স্ক একটি পাখি দেখেছিলাম। ছানা অবস্থায় কুড়িয়ে পেয়ে ভালো পোষ মানিয়ে ছিল শিকারি পাখিটিকে। পাখিটি উড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মিনিটে ৪৯টি ছবি তুললাম।

ঠিক দুবছর দশ মাস পর ২০১৭ সালের ১৪ জানুয়ারি সকালে ছোট্ট লঞ্চ ‘অলোর কোল’-এ মংলা থেকে লাউডোব যাচ্ছিলাম বনবিবির পূঁজা দেখার জন্য। বেলা পৌনে ১১টায় হঠাৎ একটি বড় গাছ থেকে বাদামি রঙের একটি শিকারি পাখিকে উড়াল দিতে দেখলাম। ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে সমানে শাটারে ক্লিক করে গেলাম। শিকারি পাখিটি দূর আকাশে মিলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওর ২৭টি ছবি তুলতে পারলাম। এরপর ক্যামেরার মনিটরে ঝুম করে পাখিটির পরিচয় নিশ্চিত হলাম। আসলে এই পাখিটি কটকায় দেখা গাঢ় রঙের সেই পাখিটিরই হালকা রূপ।

৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ শেরপুর শহরের কাছে একটি পরিত্যক্ত রিসোর্টে গিয়েছিলাম খেঁকশিয়ালের ছবি তোলার জন্য। খেঁকশিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে করতে রিসোর্টটি ঘুরে দেখতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে একটি পুকুর পাড়ে চলে এলাম। পুকুরের পাড়ে বিশাল একটি মেঘ শিরিষ গাছের উঁচু ডালে হালকা রূপের একই প্রজাতির পাখিকে ডিমে তা দেওয়ারত অবস্থায় দেখলাম। আরেকটি ডালে তখন সতর্ক পাহারায় ছিল গাঢ় রূপের পাখিটি। কিছুক্ষণ পর হালকা রূপের পাখিটি ডিমে তা দেওয়া ছেড়ে উঠল, আর সঙ্গে সঙ্গেই গাঢ় রূপের পাখি বাসায় গিয়ে বসল। অর্থাৎ দুই রূপের দুটি পাখি জোড়া বেঁধেছে। এতক্ষণ সুন্দরবনের দুটি ভিন্ন জায়গায় ও শেরপুরে দেখা দুটি ভিন্ন রূপের যে পাখিগুলের গল্প বললাম ওরা এদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি বহুরূপী ঈগল। কালো বা শিখাযুক্ত ঈগল নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে শাবাজ সাদাল। ইংরেজি নামChangeable/Crested Hawk-eagle। অ্যাক্সিপিট্রিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Nisaetus cirrhatus। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মিলে।

বহুরূপী ঈগলের দেহের দৈর্ঘ্য ৫১-৮২ সেন্টিমিটার। ওজন ১.৩-১.৯ কেজি। বছরে চার থেকে পাঁচবার পালকের রঙ বদলায় বলে একেক সময় একেক রকম দেখায়। তবে দেহের রঙে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হালকা ও গাঢ় এই দুটি পর্বের প্রাধান্য দেখা যায়। হালকা পর্বের পাখির পিঠের রঙ বাদামি। বুক-পেট সাদাটে ও তাতে লম্বা লম্বা দাগ থাকে। আর গাঢ় পর্বে একনজরে পাখিটিকে কালচে দেখায়; আসলে রঙ ঘন কালচে-বাদামি। চোখ ফিকে খাকি থেকে উজ্জ¦ল কমলা হলুদ। লেবু-হলুদ রঙের পা দুটো বেশ লম্বা। আর দেহও লম্বাটে। তবে ঠোঁট কালো। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারায় পার্থক্য নেই। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ বাদামি, মাথা সাদাটে, দেহের নিচটা সাদা থেকে পীতাভ এবং লেজে অগণিত সরু ডোরা থাকে।

এরা উন্মুক্ত বনভূমি, বনের কাছাকাছি আবাদি জমি ও বিল-জলাধারের আশপাশে একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে ইঁদুর, তক্ষক, ব্যাঙ, ছোট সাপ, মাছ ইত্যাদি। প্রজননকালে পুরুষ পাখি উচ্চস্বরে ‘কি-কি-কি-কি-কিউ ---’ শব্দে চেঁচিয়ে ডাকে।

জানুয়ারি থেকে এপ্রিল প্রজননকাল। এ সময় উঁচু গাছের মাথায় ডালপালা ও সবুজ পাতা দিয়ে বাসা গড়ে। মৌসুমে স্ত্রী পাখি ডিম পাড়ে মোটে একটি। ডিমের রঙ হালকা লালচে দাগছোপসহ সাদাটে। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে প্রায় ৪০ দিনে। এরপর মা পাখি অন্তত ২৫ দিন ছানাটিকে বুকের ওমে রাখে। প্রায় ৫২ দিন বয়সে ছানার দেহের পালক পুরোপুরি গজিয়ে গেলেও ৬০-৬৮ দিনের আগে সে ওড়া শিখে না। ছানাটি প্রায় ৮১ দিন বাসায় থাকে। তা ছাড়া পুরো প্রজনন চক্র শেষ হতে প্রায় ১১২ দিন লাগে। আয়ুষ্কাল ১৮-১৯ বছর। 

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ