সামনে আরও খারাপ সময়

গেল সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চলতি অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সেপ্টেম্বরে শেষে যেখানে দিনে ২ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, অক্টোবরে এই সংখ্যা তিন থেকে সাড়ে তিন হাজারে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তার বলছেন, নভেম্বরে শেষের দিকে গিয়ে আক্রান্তের হার নিম্ন হতে পারে। সেজন্য তারা এখনই সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দিয়েছেন। যদিও কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় তিন মাসের কার্যক্রম চলমান আছে। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে এটা নিয়ে কনসার্ন, অন্যদেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা আগস্টের ২০ হাজার ৫৩৬ জনের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। একই সময়ে মারা গেছেন ১৪৮ জন। বছরের প্রথম আট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রোগী যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন এবং মারা গেছেন ২৪৫ জন। অর্থাৎ, বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি এবং মোট মৃত্যুর ৬০ শতাংশের বেশি ঘটেছে শুধু সেপ্টেম্বরেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩০ সেপ্টেম্বরের ডেঙ্গুবিষয়ক দৈনিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

চলতি বছরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৪০৯ জনে দাঁড়ায়। মার্চে ৩৫৩ জন এবং এপ্রিলে ৬৪০ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ৭১৪ জন হলেও জুনে তা এক লাফে বেড়ে ২ হাজার ৯০৭ জনে পৌঁছায় এবং  জুলাইয়ে তা বেড়ে ৯ হাজার ২০৬ জন হয়। আগস্ট, সেপ্টেম্বরে তা আরও বৃদ্ধি পায়। মাসভিত্তিক এ চিত্রে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুম থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই চার মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৬ হাজার ৪২৩ জন, যা চলতি বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় ৯৬ শতাংশ। বিশেষ করে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি সেপ্টেম্বরে চেয়েও ভয়াবহ হবে। সেজন্য এখনই বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি খুব খারাপই হবে। নভেম্বরের শেষ দিকে এই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হানও প্রায় একই বথা বলেন। তিনি বলেন, অক্টোবরেও পরিস্থিতি খারাপ থাকবে। নভেম্বরে গিয়ে অবস্থার উন্নতি হবে। সেজন্য এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডোবা, নালা, নর্দমা খালসহ যেসব জায়গায় এডিস মশা জন্মাতে পারে, সেগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। মশা নিধনের সব ধরনের কার্যক্রম চালাতে হবে। ঘরে ফুলের টবে বা অন্য কিছুতে যেন পানি জমে না থাকে, সেই দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বেলকনি কিংবা ছাদে বা পাকিং গ্রাউন্ডের জমা পানি ফেলে দিতে হবে। মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে।

সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যাও সর্বোচ্চ : ডেঙ্গুতে আক্রান্তের পাশাপাশি রেকর্ড মৃত্যু হয়েছে সেপ্টেম্বরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মারা গেছেন ১৪৮ জন, যা চলতি বছরের প্রথম আট মাসের মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি। এ ছাড়া বেশি মৃত্যু হয়েছে জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬ ও আগস্টে ৪৩ জন। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ২৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ১১৫ জন ও নারী ১২৬ জন। ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ২৯ জন। ৩৬ থেকে ৪০ বছর এবং ৪১ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৪ জন করে মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১৬ জন এবং ৬১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী ১৪ জন মারা গেছেন। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর সংখ্যা ১২। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার সুস্থতার হার বেশি ছিল।

ঢাকার বাইরে বাড়ছে রোগীর চাপ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ১৭৪ জন। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি হন ৬১ হাজার ৮০ জন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের বড় অংশই ঢাকা মহানগরীর বাইরের বাসিন্দা। বিভাগভিত্তিক বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে (ঢাকা মহানগরী বাদে) ১৩ হাজার ৮৩৫ জন। এরপর খুলনায় ১২ হাজার ৮২৫ জন, চট্টগ্রামে ১১ হাজার ৮০৮ জন, বরিশালে ১০ হাজার ৫২৯ জন, রাজশাহীতে ৫ হাজার ২০৭ জন, ময়মনসিংহে ৪ হাজার ৪৩৫ জন, রংপুরে ২ হাজার ৪৫৪ জন ও সিলেট বিভাগে ৩৭৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ঢাকা মহানগরীর হাসপাতালগুলোয় মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় যথাক্রমে ২৯ ও ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মহানগরীর বাইরে ঢাকা বিভাগে ১৫ জন, খুলনায় ৪৭ জন, চট্টগ্রামে ২৪ জন, ময়মনসিংহে ২০ জন, রাজশাহীতে ১৪ জন, রংপুরে ছয়জন, বরিশালে ১৯ জন ও সিলেট বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

এক দিনে নতুন রোগী প্রায় ২ হাজার : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৪৮ জন। একই সময়ে মারা গেছেন ছয়জন। নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ১৯৯ জন এবং নারী ৭৪৯ জন। এর মধ্যে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ২৭৮ জন, ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ২৮৪ জন এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২৬৯ জন ও ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ৫ বছরের কম বয়সী ৭৮ শিশুও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও তিনজন নারী।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিনেও হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তির এই উচ্চ সংখ্যা ডেঙ্গুর চলমান সংক্রমণের চিত্র তুলে ধরছে। ওই দিন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৮৯০ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ৪৮৫ জন।

ডেঙ্গুর মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর জুন থেকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে এবং সেপ্টেম্বর মাসে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রথম প্রকট আকারে ধারণ করে ২০১৯ সালে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ ছিল। সেই বছর ১ লাখ ১ হাজার ৩৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া ২৬৩ জনের মৃত্যু পর্যালোচনা করে আইইডিসিআর ১৬৪ জনের ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু নিশ্চিত করে। করোনার সময় কিছুটা কমে ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিত আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ বছরের মতো আগে কখনোই এত আক্রান্ত বা মৃত্যু হয়নি। এ বছর হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে ভর্তি হয় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।