শয্যা বেড়েছে, বাড়েনি জনবল

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা বেড়েছে ১৯টি। কিন্তু সে অনুসারে বাড়েনি কোনো জনবল। ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়েই চলছে ৫০ শয্যার হাসপাতালটি। এর মধ্যেই অনুমোদিত ২২০ পদের ৬৭টিই শূন্য। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও কারিগরি জনবল না থাকায় এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা ব্যাহত হচ্ছে। গাইনি, অ্যানেসথেসিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০১২ সালে ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়েই হাসপাতালটিতে ৫০ শয্যার কার্যক্রম চালু করা হয়। এরপর ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ৫০ শয্যার উপযোগী নতুন জনবল কাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে শয্যা বাড়লেও বাড়েনি প্রয়োজনীয় জনবল।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনুমোদিত পদ ২২০টি। এর মধ্যে কর্মরত ১৫৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬৭টি পদ। ১২টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র চারজন। শূন্য আটটি পদ। ২৯টি মেডিকেল অফিসার ও সহকারী সার্জনের পদের বিপরীতে কর্মরত ১২ জন। শূন্য রয়েছে ১৭টি পদ। ১২টি সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) পদের বিপরীতে কর্মরত সাতজন। শুধু চিকিৎসক ও কারিগরি জনবল নয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও সংকট রয়েছে। বর্তমানে মাত্র দুজন কর্মী পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। মুমূর্ষু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত ট্রলিও নেই।

হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০ জন। আর অন্তর্বিভাগে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন গড়ে ৫৫ থেকে ৬৫ জন রোগী।

গত বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের উপচেপড়া ভিড়। ৫০টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি ছিলেন ৬৩ রোগী। অতিরিক্ত রোগীদের জন্য বারান্দা ও করিডরে মেঝেতে অতিরিক্ত শয্যা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। টেকনিশিয়ান না থাকায় এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সনোলজিস্ট না থাকায় আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। একই কারণে ব্যাহত হচ্ছে ইসিজি সেবাও। এসব পরীক্ষা করাতে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এদিকে গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক না থাকায় প্রসূতি রোগীদের চিকিৎসাসেবাতেও সমস্যা হচ্ছে। স্বাভাবিক প্রসব করানো সম্ভব হলেও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোগীদের অন্যত্র পাঠাতে হচ্ছে।

হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের ইনচার্জ হাসিনা আক্তার বলেন, ‘প্রতিদিনই অনেক গর্ভবতী নারী হাসপাতালে আসেন। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে সমস্যা হয়। সিজারের প্রয়োজন হলে চিকিৎসককে জানানো হলে এসে অস্ত্রোপচার করে যান।’

চিকিৎসা নিতে আসা সুমন মিয়া বলেন, ‘আমার স্ত্রী তিন মাসের গর্ভবতী। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় তাকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। মধ্যবিত্তরা চায় সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে রোগী নিয়ে এলে স্বজনরাও রোগী হয়ে যায়।’

খায়রুল নাহার নামে এক রোগী বলেন, ‘চিকিৎসক আমাকে এক্স-রে করতে দিয়েছেন। কিন্তু হাসপাতালে এক্স-রে না হওয়ায় বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এই সুবিধা থাকলে আমাদের মতো সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি কমত।’

হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অভিজিৎ বনিক বলেন, ‘প্রতিদিন প্রচুর পরীক্ষা করতে হয়। জনবল সংকটের কারণে আমাকে একাই রক্ত সংগ্রহ, নমুনা প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষা ও রিপোর্ট দেওয়ার কাজ করতে হচ্ছে। এতে কাজের চাপ বাড়ছে এবং সেবা ব্যাহত হচ্ছে।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আকাশ নুনিয়া বলেন, ‘প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় হাসপাতাল পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা গাইনি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকা। ফলে আমরা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির মেশিন থাকলেও এগুলো পরিচালনার লোক নেই। তাই রোগীদের এসব সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত জনবল থাকলে হাসপাতালেই রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া সম্ভব হতো।’