পাতা বাড়লে টাকাও বাড়ে

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৬ এএম

সরকারি হিসাব অনুযায়ী মামলার এজাহার, প্রাথমিক তথ্যবিবরণী, জামিন কিংবা জামিন নামঞ্জুরের আদেশ, চার্জশিট, রায়সহ বিভিন্ন সময়ের আদেশের অনুলিপি তুলতে প্রতি পাতা খরচ পড়ে সর্বসাকুল্যে ৮ টাকা। কিন্তু চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতের অনুলিপি শাখা থেকে নকল পেতে প্রতি পাতা ৬০ থেকে ৭০ টাকা গুনতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের। শুধু তাই নয়, স্পর্শকাতর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় বা আদেশের নকল পেতে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষেত্র বিশেষে পাতা প্রতি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করার নজির আছে বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মোহাম্মদ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী। 

এপিপি বলেন, অতিরিক্ত টাকা না দিলে দিনের পর দিন আদালতে ঘুরেও নকল কপি পাওয়া সম্ভব হয় না। আদালতের অনুলিপি শাখা এবং বিভিন্ন সেকশনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনজীবীদের ক্লার্ক-মুহুরীদের একটি চক্র অবৈধ এই টাকা আয় করছে।

তবে নকল সরবরাহের ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আবেদনকারীরা অনুলিপির চাহিদামতো কোর্ট ফি ও কোর্ট ফলিও দিলেই নকল বা সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করা হয়। প্রতি পাতা হিসেবে টাকা আদায়ের অভিযোগ সত্য নয়।

জানা গেছে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী অনুলিপির জন্য প্রতি পাতা কোর্ট ফলিও ভ্যাটসহ ৪ টাকা এবং ২ টাকা ৪০ পয়সার কোর্ট ফিসহ সর্বসাকুল্যে খরচ পড়ে ৬টা ৪০ পয়সা। কিন্তু চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতের অনুলিপি শাখায় নকলের প্রতি পাতা বাবদ বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন দরিদ্র ও অসহায় বিচারপ্রত্যাশীরা।

তথ্য সূত্র বলছে, চট্টগ্রামে দেওয়ানী ও ফৌজদারি মিলে আদালতের সংখ্যা প্রায় ১০০টি। অনুলিপি শাখা আছে প্রায় ১০টি। এসব নকল শাখা থেকে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজারের বেশি বিভিন্ন মামলার নথি বা রায় ও আদেশের নকল সরবরাহ করা হয়। নকল সরবরাহ খাতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা বিচারপ্রার্থী বা আইনজীবীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।

আইনজবীবীরা জানান, মামলার নথি পেতে একটি আবেদনপত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকা দিয়ে কিনে তা পূরণ করে ২৫ টাকা কোর্ট ফিসহ (স্ট্যাম্প) সংশ্লিষ্ট আদালতের নকল শাখায় জমা দিতে হয়। পরে ওই আবেদনপত্র যায় সংশ্লিষ্ট আদালতে। এ জন্য আদালতের কর্মচারীদের দিতে হয় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। মামলার সার্টিফাইড কপি পেতে তদবির না করলে আবেদনপত্র রেকর্ড রুমে পড়ে থাকে। নথি পাওয়া যায় না। অনেকেই বাড়তি টাকা দিয়ে নকল নেন। একটি মামলার বা নথির অনুলিপির জন্য সর্বনিম্ন ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। নথির পাতার সংখ্যা বাড়লে প্রতি পাতায় নেওয়া হয় ৬০  থেকে ৭০ টাকা। পাতা যত বাড়ে, টাকার অঙ্কও তত বাড়ে।

সৈয়দ মুরসালিন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, চট্টগ্রামের তৃতীয় সাব জজ আদালতে জমিজমা-সংক্রান্ত বাদীর অনুপস্থিতিতে একটি মামলা খারিজের আদেশ হয় চলতি বছরের ১৫ জুন। আদেশের অনুলিপি পেতে তার নিযুক্ত আইনজীবী আবেদন করেন গত ২০ জুলাই। প্রায় এক মাসের মাথায় তিনি অনুলিপি হাতে পান গত ১৮ আগস্ট। তিন পাতার ওই আদেশের অনুলিপির জন্য তাকে প্রতি পাতায় গুনতে হয়েছে ১ হাজার টাকা।

সম্প্রতি সরেজমিন চট্টগ্রাম জেলা আদালতের অনুলিপি শাখায় যান এই প্রতিবেদক। পরিচয় গোপন রেখে একটি মামলার রায়ের নকল পেতে প্রতি পাতা কত টাকা খরচ পড়বে জানতে চাইলে দপ্তরের প্রধান তুলনাকারী মো. শাহ আলম মজুমদারের পাশে বসা একজন তুলনাকারী বলেন, ‘প্রতি পাতা ৬০ টাকা লাগবে।’

তবে উক্ত অনুলিপি শাখার প্রধান তুলনাকারী মো. শাহ আলম মজুমদার জানান, যত পৃষ্ঠাই হোক সিভিল মামলার রায়ের অনুলিপির জন্য লাগে ৮ টাকার কোর্ট ফি। ফৌজদারি মামলার রায়ের জন্য প্রতি পৃষ্ঠার জন্য ২ টাকার কোর্ট ফি লাগে। তার দপ্তর থেকে (অনুলিপি শাখা) গড়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার পৃষ্ঠার অনুলিপি সরবরাহ করা হয়। বিচারপ্রার্থীদের জরুরি ভিত্তিতে অনুলিপি সরবরাহ করতে হলে সময় লাগে দুই থেকে তিন দিন।

অনুলিপি সরবরাহে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহ আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবেদনকারীরা মামলার রায় বা আদেশ সরবরাহের জন্য কোর্ট ফি ও কোর্ট ফলিও কিনে দেন। আমরা টাইপ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর করে সরবরাহ দিই। কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় না।’

চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অনুলিপি শাখার প্রধান তুলনাকারী রহমত উল্লাহ বলেন,  তার দপ্তর থেকে প্রতিদিন গড়ে বিভিন্ন মামলার রায় বা আদেশের ১০০ থেকে ১৫০ অনুলিপি সরবরাহ করা হয়। তিনি ২০১৩ সাল থেকে এখানে কর্মরত আছেন। এই দপ্তরে অনুলিপি সরবরাহের জন্য কোনো টাকা নেওয়া হয় না। 

চট্টগ্রাম আদালতের ট্রেজারি শাখার ট্রেজারার ফজলে আকবর চৌধুরী জানান, ১, ২, ৩, ৪, ৫. ১০ ও ২০ টাকার কোর্ট ফি এবং ২ টাকার (প্রতি পিস)  কোর্ট ফলিও ভেন্ডারদের সরবরাহ করা হয়। ভেন্ডার রতন কুমার নাথ জানান, ১০০ টাকার কোর্ট ফি ২৫ শতাংশ ভ্যাটসহ ১২০ টাকা বিক্রি করা হয়। প্রতি পৃষ্ঠা কোর্ট ফলিও বিক্রি করা হয় ৪ টাকা। আইনজীবীসহ বিভিন্ন হাত ঘুরে নকল শাখা পর্যন্ত গেলে টাইপিং খরচসহ নকল পেতে কিছু টাকা হয়তো নেওয়া হয়। কিন্তু কেউ মাত্রাতিরিক্ত টাকা নেওয়া উচিত নয়।’ 

তথ্য সূত্র জানায়, সরকারি  সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ চট্টগ্রামের চিফ  মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের (সিএমএম) কাছে সরাসরি দাখিল করা যাবে। সম্প্রতি এ জন্য  খোলা হয়েছে একটি ই-মেইল, সিএমএমের দপ্তরের বাইরে বসানো হয়েছে স্বচ্ছ অভিযোগ বক্স। সরকারি  সেবায় জবাবদিহিতা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বে-আইনি কর্মকা- সংক্রান্ত তথ্য গ্রহণের জন্য ‘সিএমএম, চট্টগ্রাম সমীপে’ নামে এই অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করে এ বিষয়ে একটি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত