হাম-ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগর পরিকল্পনায় গুরুত্বারোপ বিআইপির

দেশে হাম ও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনাকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটি বলেছে, চিকিৎসা ও মশক নিধনের পাশাপাশি নগরের অবকাঠামো, পরিবেশ, ভূমি ব্যবহার, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনঘনত্ব ও খোলা জায়গার পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘হাম ও ডেঙ্গুঃ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার ভূমিকা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। বিআইপির উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মোঃ শহীদুল্লাহ এবং বোর্ড সদস্য (মেম্বারশিপ অ্যাফেয়ার্স) পরিকল্পনাবিদ সাদী মোঃ হারুন বক্তব্য দেন।

সূচনা বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, চলতি বছরে দেশে হাম ও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য সংকটে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন দায়িত্বশীল পেশাজীবী হিসেবে নগর পরিকল্পনাবিদদেরও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নগর পরিকল্পনা কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনাবিদদের দায়িত্ব জনগণের সামনে তুলে ধরতেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

মূল প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শহরগুলোতে ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, নগর তাপদাহ ও অনিরাপদ পানির মতো জনস্বাস্থ্য সংকট ক্রমেই বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে শুধু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করলে হবে না; নগরের অবকাঠামো, পরিবেশ ও পরিকল্পনাও মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, রাস্তা, ড্রেনেজ, জলাশয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসনের ঘনত্ব, খোলা জায়গা ও ভূমি ব্যবহারের ধরন জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জরুরি চিকিৎসা ও মশক নিধনের পাশাপাশি উৎসস্থলে ঝুঁকি কমানো প্রয়োজন। নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্তসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাই ভবন নির্মাণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পানি জমা প্রতিরোধ এবং নির্মাণস্থলে নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

হামের ক্ষেত্রে টিকা কভারেজের ঘাটতি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমি ব্যবহার ও জোনিং, ড্রেনেজ ও পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খোলা জায়গা সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের স্থান নির্বাচন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনাবিদদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিআইপির সহ-সভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, জনস্বাস্থ্যকে শুধু মানুষের অসুস্থতা হিসেবে দেখলে হবে না; পুরো বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতাও নিশ্চিত করতে হবে। ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার আলোকে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগরায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকে যথাযথভাবে বিবেচনা না করার কারণে বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য কোনো মৌসুমি বিষয় নয়; সারা বছর গুরুত্বের সঙ্গে এটি বিবেচনা করতে হবে। নিরাপদ পানির উৎস সংরক্ষণ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্পবর্জ্যের কারণে মেঘনাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর দূষণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির উৎস সংকট তৈরি হতে পারে। তাই নদী ও পানির উৎস রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি আগামী ২০–৩০ বছরের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে বিআইপি সরকারকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পেশাগত সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানান।

বিআইপির কোষাধ্যক্ষ আবু ছালেহ মোঃ শহীদুল্লাহ বলেন, জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, স্থানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান কার্যক্রমের স্থান নির্বাচন এবং হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় স্থান নির্ধারণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে কোভিড-১৯-এর মতো কোনো মহামারি দেখা দিলে কোথায় আইসোলেশন বা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন হবে, তাও আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বিআইপির বোর্ড সদস্য (মেম্বারশিপ অ্যাফেয়ার্স) সাদী মোঃ হারুন বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বপরিকল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনগণকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্য কোনো একদিনের বিষয় নয়। পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নগরায়ন, জনঘনত্ব ও দারিদ্র্য বেশি এমন এলাকায় হাম ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় শহরের জনঘনত্ব ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পিতভাবে পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ), যানবাহন চলাচলজনিত প্রভাব মূল্যায়ন (টিআইএ) ও কৌশলগত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের (এসইআইএ) পাশাপাশি স্বাস্থ্য প্রভাব মূল্যায়ন (এইচআইএ) অন্তর্ভুক্ত করা হলে প্রকল্পের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

দীর্ঘদিন নির্মাণাধীন বা অসম্পূর্ণ স্থাপনা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি ডেঙ্গুর প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধুনিক জিআইএস, ড্রোন ও ম্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট এলাকায় কোথায় পানি বা বর্জ্য জমে আছে এবং কোথায় মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল রয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। প্রেস ক্লাব এলাকার মতো নির্দিষ্ট একটি এলাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব স্থান চিহ্নিত করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেশের বিশেষজ্ঞদের রয়েছে।

জনস্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে না দেখে স্থানীয় সরকার ও নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা এবং এ ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনাবিদদের ভূমিকা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওয়াসার পানি সরবরাহ লাইনের পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং, লাইনের বয়স এবং পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের মধ্যে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত সংযোগের তথ্য নিয়মিতভাবে হালনাগাদ রাখা জরুরি। এসব তথ্য জিআইএসভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনাকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনায় শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, দুই সিটি করপোরেশনে পরিকল্পনাবিদের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় নিয়মিত ম্যাপিং, পরিকল্পনা ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনায় জনবল বৃদ্ধি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য সমন্বয়ের জন্য একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সেটিকে জিআইএসের সঙ্গে সমন্বিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিআইপি ও এর সদস্যরা সরকারকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে ১০টি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন বিআইপির সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।

প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—আবাসিক, শিল্প, খোলা জায়গা ও জলাধারের সুনির্দিষ্ট ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত এবং বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ও জলাশয় সংরক্ষণ; বড় নগর প্রকল্প ও পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য প্রভাব মূল্যায়ন বা স্বাস্থ্য-সংবেদনশীল স্ক্রিনিং অন্তর্ভুক্ত করা; ড্রেনেজ, জলাধার, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।

এ ছাড়া ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, টিকা কভারেজ, জনঘনত্ব ও তাপঝুঁকির তথ্য জিআইএসের মাধ্যমে একত্রিত করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা; নিম্ন আয়ের ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান সুবিধা সহজলভ্য করতে স্থানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ; পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, অগ্রগতি মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা; ফুটপাত, পার্ক, হাঁটার উপযোগী পরিবেশ এবং সবুজ-নীল অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত ও ছাদে পানি জমা প্রতিরোধ এবং নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা; জনঘনত্ব, শিশুদের সংখ্যা, টিকা কভারেজ ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবস্থান বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কার্যক্রমের স্থান নির্ধারণ এবং জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্থানিক তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অগ্রাধিকারভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের শেষে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।