জ্বালানি মজুত ছাড়তে ইউরোপের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ডিজেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের মজুত থেকে ডিজেল বাজারে ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার কথা বিবেচনা করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর বিবিসির। 

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ট্রাম্প বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে ডিজেলের মজুত রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তাদের সেই মজুতের কিছু অংশ বাজারে ছাড়তে বলা হতে পারে। এর আগে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও ইউরোপকে ‘অবিলম্বে’ নিজেদের ডিজেল মজুত ব্যবহারের প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানান।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাজ্যে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। দেশটির মোট ডিজেল চাহিদার অর্ধেকের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়, যার প্রায় ৩১ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি—যে পথে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়—বন্ধ থাকায় বাজারে জ্বালানির দাম আরও বেড়েছে। এর পাশাপাশি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি কমে যাওয়া এবং ইউক্রেনের হামলায় রুশ তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। চীনের শোধনাগারগুলোও অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অক্টোবরে কিছু জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করেছে বলে জানা গেছে। 

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ডিজেল সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করে, যার বড় অংশ যায় লাতিন আমেরিকায়। রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার পর ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলোও মার্কিন ডিজেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। 

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ডিজেল দেশের ভেতরে রাখলে সরবরাহ বাড়বে এবং পাম্পের দাম কমতে পারে। বিশেষ করে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের জন্য জ্বালানির বাড়তি খরচ কমানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হবে এবং অন্যান্য দেশে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। আর্গাস মিডিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ফাইফের মতে, মার্কিন সরবরাহ বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে সম্ভাব্য মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা করছে যুক্তরাজ্য। বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের জ্বালানিমন্ত্রী মার্টিন ম্যাকক্লাসকি ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেন।

ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র আনা-কাইসা ইতকোনেন জানিয়েছেন, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুমকি ‘পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান’ করছে। তাঁর ভাষায়, মার্কিন ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করা কারও জন্যই লাভজনক হবে না এবং এতে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে ইউরোপের হাতে এখনও জরুরি জ্বালানি মজুত রয়েছে। বছরের শুরুতে সমন্বিতভাবে কৌশলগত জ্বালানি মজুতের একটি অংশ বাজারে ছাড়ার পরও মজুতের কিছু অংশ অবশিষ্ট আছে। ইইউর নিয়ম অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোকে অন্তত ৬১ দিনের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবহারের সমপরিমাণ মজুত রাখতে হয়।

এদিকে যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, সম্ভাব্য ডিজেল ঘাটতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।