ফিফা আসিয়ান কাপে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের বিধ্বস্ত হার দিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে বাংলাদেশ। কয়েক যুগ পর এমন বড় ব্যবধানে পরাজয়ে যখন ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ, ঠিক তখনই সামাজিক মাধ্যমে জাতীয় দলের দুই ফুটবলার সাদ উদ্দিন ও সোহেল রানা জুনিয়রের নাইটক্লাবে থাকার কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও ছবিগুলো ঠিক কখন তোলা হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া। ম্যাচ শেষে বড় হারের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধান কোচ টমাস ডুলি তুলে ধরেছেন দুই দলের সামগ্রিক ব্যবধানের কথা। তার মতে, র্যাংকিং, ঘরোয়া লিগের মান এবং প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের অভিজ্ঞতায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দলগুলোর চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। ডুলি বলেন, ‘আপনি যদি ১৮১ নম্বরে থাকেন আর প্রতিপক্ষ যদি ১১৬, ১৩০ কিংবা ১৪০ নম্বরে থাকে, তাহলে স্পষ্ট বোঝা যায়, র্যাংকিংয়ে যত ওপরে থাকা যায়, খেলোয়াড় ও দল হিসেবে তারা তত ভালো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দলগুলো নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।’
তবে মাঠের বাইরের ঘটনাও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সাদ ও সোহেলের কিছু ছবি। ছবিতে তাদের কয়েকজন নারীর সঙ্গে একটি নাইটক্লাবে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়। তবে ছবিগুলো ম্যাচের রাতেই তোলা হয়েছিল কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। দলীয় ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম বাবু জানিয়েছেন, ম্যাচ শেষে রাতের খাবার খেয়ে খেলোয়াড়দের নিজ নিজ কক্ষে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘রাতের খাবারের পর খেলোয়াড়রা ঘুমাতে গেছে। আমরা তো সারা রাত তাদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।’ তবে কেউ নির্দেশ অমান্য করে বাইরে গিয়ে থাকলে শৃঙ্খলা কমিটি ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক তারকা ফুটবলাররা। ১৯৮৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়সূচক গোল করা আশরাফ উদ্দিন চুন্নু বলেন, ‘৪১ বছর আগে জাতীয় স্টেডিয়ামে বিশ^কাপ প্রিলিমিনারি কম্পিটিশনে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে আমি উইনিং গোল করেছিলাম। সেবার আমরা ২-১ গোলে জিতেছিলাম। আর আজ দেখলাম সেই বাংলাদেশেরই এমন বিধ্বস্ত অবস্থা। খেলা দেখে সত্যিই লজ্জিত হয়েছি। আর যদি ম্যাচের পর যে ধরনের ঘটনা সামনে এসেছে, সেগুলো সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত।’
আরেক সাবেক তারকা আবদুল গাফ্ফার বলেন, ‘কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের ফুটবল! যে দলকে আমরা একসময় হারিয়েছি, আজ আধুনিক ফুটবলে এসে সেই দলের কাছেই গো-হারা হারছি। প্রথমার্ধে ছয় গোল হজম করাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের ফুটবলের কী দুরবস্থা।’ ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে কোচ ও খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ম্যাচে কোচ ও ফুটবলারদের অদক্ষতার প্রমাণ দেখা গেছে। অন্যদিকে সাদ ও সোহেলের নাইটক্লাব-কা- যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি দলের বর্তমান ম্যানেজমেন্টের অবস্থাও প্রশ্নের মুখে ফেলে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ফুটবলের অবস্থা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।’
সাবেক তারকা ফুটবলার সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বির ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সকে ‘ধ্বংস হওয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘খুবই খারাপ। কোচের এত অদক্ষতা আগে দেখিনি। তার কোনো গেম প্ল্যানিংই ছিল না। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে খেলার আগে প্রতিপক্ষের ভিডিও ক্লিপ দেখে কীভাবে খেলতে হবে, সেই পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। কিন্তু সেটি করা হয়নি।’ কোচের কৌশল নিয়ে সাব্বির আরও বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ম্যান মার্কিং না থাকার কারণে আমরা প্রথমার্ধেই ছয়টি গোল হজম করেছি। গোলকিপার পরিবর্তনের কথাও ভাবা উচিত ছিল। আসলে কোচ পুরো টিম ম্যানেজমেন্টেই ব্যর্থ হয়েছেন। কোন ফর্মেশনে খেলব, লেফট না রাইট উইংয়ে কে বেশি কার্যকর, এসব বিষয়ও পরিকল্পনার মধ্যে থাকা দরকার ছিল। প্রতিপক্ষ যাতে স্পেস না পায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হতো।’
খেলোয়াড়দের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাব্বির। তার বক্তব্য, ‘সাদ ও সোহেল যদি ম্যাচের আগের রাতে ক্লাবে গিয়ে থাকে, তাহলে এটা কী ধরনের মানসিকতা? খেলোয়াড়দের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেটাও কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব। আমরা যখন খেলতাম, কোনো কারণ ছাড়া বাইরে যেতাম না।’ বাংলাদেশের ফুটবলের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরে সাব্বির বলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড়দের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ কম। প্রিমিয়ার লিগ ছাড়া দেশের অধিকাংশ জেলায় নিয়মিত লিগ হয় না। এই জায়গায় বাফুফের অদক্ষতা রয়েছে। ফুটবলের এই অবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার নজর দেওয়া উচিত।’