ময়মনসিংহ নগরীতে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের শিশুসহ চার প্রজন্মের চারজন রয়েছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে নগরীর আকুয়া বাইপাস সড়কের গন্দ্রপা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানা যায়, ঢাকা থেকে জামালপুরগামী রাজীব পরিবহনের একটি বাস আকুয়া বাইপাস সড়ক দিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় বিপরীত পাশ থেকে আসা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর সিএনজি অটোরিকশাটি বাসের ভেতরের দিকে ঢুকে দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে অটোরিকশায় থাকা যাত্রীরা গুরুতরভাবে আহত হয়ে আটকা পড়েন। ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। এক নারী ও এক শিশু জীবিত থাকলেও উদ্ধারের পরপরই মারা যান। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতজনে। নিহতদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, তিনজন নারী ও একজন শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত সাতজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন জামালপুর সদর উপজেলার নান্দিনা এলাকার দড়িহামিদপুর গ্রামের রাশিদা বেগম (৭০), তার ছেলে রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫০), মোফাজ্জলের মেয়ে মর্জিনা আক্তার (২৫) এবং মর্জিনার ছেলে মিনাল (৫)। তারা জামালপুর থেকে গাজীপুরে যাচ্ছিলেন। মোফাজ্জল হোসেন গাজীপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। নিহত অপর তিনজনের পরিচয় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন একই পরিবারের শিশুসহ চারজন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মামুন হোসেন জানান, জুমার নামাজে যাওয়ার সময় তিনি বিকট শব্দ শুনে দ্রুত ঘটনাস্থলে আসেন। সেখানে গিয়ে দেখতে পান বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে গেছে। পরে স্থানীয়রা বাসটি ঠেলে সরিয়ে অটোরিকশাটি বের করেন। এরপর অটোরিকশার ভেতর থেকে যাত্রীদের বের করে আনা হয়।
মামুন হোসেন আরও জানান, অটোরিকশার ভেতরে এক নারী ও এক শিশুকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাদের উদ্ধার করে বাইরে আনার পর হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যেই ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, জীবনে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা আগে দেখেননি। স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল বলেন, সংঘর্ষের শব্দে মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাসের ভেতরের দিকে ঢুকে সিএনজিটি এমনভাবে দুমড়েমুচড়ে গেছে যে ভেতরে থাকা যাত্রীরা আটকা পড়েছেন। স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে বাসটি সরানোর চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় একে একে অটোরিকশার ভেতর থেকে যাত্রীদের বের করে আনা হয়। ভয়াবহ এ দৃশ্য দেখে ঘটনাস্থলে থাকা অনেকেই হতবাক হয়ে পড়েন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। অটোরিকশাটি বাসের ভেতরের দিকে ঢুকে দুমড়েমুচড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে কিছুটা বেগ পেতে হয়। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা মিলে অটোরিকশার ভেতর থেকে যাত্রীদের বের করে আনেন। পরে নিহতদের মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
ফায়ার সার্ভিসের ময়মনসিংহ স্টেশন অফিসার মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার পর বাসটি ফেলে ঘটনাস্থল থেকে চালক ও তার সহকারী পালিয়ে যান। তাদের আটকের চেষ্টা চলছে। পুলিশ বাসটি আটক করেছে।
ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উভয় যানবাহনের অতিরিক্ত গতির কারণে কেউ কাউকে সাইড দিতে না পারায় মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তিরা সবাই সিএনজি অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে বাস চলাচল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দ্রুতগতির যানবাহনের কারণে বাইপাস সড়কে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীদের ঝুঁকি বাড়ছে।
দুর্ঘটনার কারণে আকুয়া বাইপাস সড়কে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হয়। দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন সড়কে থাকায় এবং উদ্ধারকাজ চলায় যান চলাচলে বিঘœ ঘটে। পরে উদ্ধারকাজ শেষ হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। এ ঘটনায় একই পরিবারের চারজনসহ সাতজনের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।