ব্যাটারিতে পরিবেশের বারোটা

সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, সারা দেশে ৮০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। একটি অটোরিকশায় কমপক্ষে চারটি করে সিসা-অ্যাসিড (লিড-অ্যাসিড) ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের একটি ব্যাটারি ২০০ থেকে ৪০০ বার চার্জ দেওয়া যায়। অর্থাৎ গড়ে একটি ব্যাটারির আয়ুষ্কাল এক বছর। সে হিসাবে বছরে অকেজো হচ্ছে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ব্যাটারি। একটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারিতে সাধারণত ৮ থেকে ১২ কেজি সিসা থাকে। অর্থাৎ এসব ব্যাটারিতে থাকা সিসার পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার থেকে ৩ লাখ ৮৪ হাজার টন। বিপুল পরিমাণ সিসা থাকা এসব ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের (রিসাইকেল) নামে যত্রতত্র ভাঙা ও সিসা গলানোর ফলে সিসাদূষণে পরিবেশের বাজছে বারোটা।

লিড এক্সপোজার অ্যাসেসমেন্ট ইন বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুনর্ব্যবহার ও খোলা জায়গায় সিসা গলানোয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও পিওর আর্থ নামে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিষাক্ত স্থান শনাক্তকরণ কর্মসূচির তথ্য ব্যবহার করে গবেষণাটি সম্পন্ন করে। অন্য একটি গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে ওই গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, সিসাদূষণের ফলে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি হারাচ্ছে। বাংলাদেশের সিসাদূষণের অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে অটোরিকশার লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি।

নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার বিষয়ে জাতীয় সংসদে গত ৭ সেপ্টেম্বর সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য রেহেনা আক্তার রানুর এক নোটিসের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। তবে এই অটোরিকশাগুলো পুরোপুরি যান্ত্রিক যান না হওয়ায় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিতে (বিআরটিএ) কোনো নিবন্ধন নেই। এ ছাড়া কোনো কোনো সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভা এগুলোর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করলেও সমন্বিত সংখ্যা নির্ধারণের কোনো উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার (ইউএনসিটিএডি) একটি বিশেষ অধিবেশনে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি সঞ্চিতা হক অটোরিকশার বিস্তার নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, এক দশকেরও কম সময়ে বাংলাদেশে ই-রিকশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব যানবাহনের বড় অংশেই সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। ব্যবহৃত ব্যাটারির সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে এই সুবিধার বিপরীতে নতুন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। একটি অটোরিকশায় চার থেকে ছয়টি ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি ব্যাটারিতে ৭০ শতাংশের বেশি সিসা থাকতে পারে। ফলে অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিমাণও বাড়ছে।

কীভাবে দূষণ ছড়াচ্ছে : সরকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে শিল্প পর্যায়ে ব্যাটারি রিসাইকেল করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে দেশে যে পরিমাণ ব্যাটারি অকেজো হচ্ছে তার তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কম। লিড এক্সপোজার অ্যাসেসমেন্ট ইন বাংলাদেশ প্রতিবেদনেই দাবি করা হয়, ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারে ১ হাজার ১০০টি অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ ইউনিট রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়। দেশের ৬৪ জেলাকে দিয়ে এই সংখ্যা গড় করলে দেখা যায় প্রতিটি জেলায় এমন সংখ্যা থাকতে পারে ১৭টি। ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তবে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে এমন ব্যাটারি কারখানার সংখ্যা বেশি। অকেজো এসব ব্যাটারি কারখানায় নিয়ে খুলে সিসা বের করা হয়। অন্যান্য উপাদানও আলাদা করা হয়। সিসা মূল্যবান হওয়ায় এগুলো ফেলে দেওয়া হয় না। একটি লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিতে ৮ থেকে ১২ কেজি সিসা থাকে। পুরনো ব্যাটারির সিসা খোলা জায়গায় গলানোর কারণে মাটি, পানি এবং পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশে ফসলে ছড়ায়। ফসল থেকে এই সিসা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হাফিজুর রহমান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের অটোরিকশার কোনো ডেটাবেজ নেই। কেউ এগুলো নিয়ন্ত্রণও করে না। বর্তমান বাস্তবতায় চাইলেই অটোরিকশা বন্ধ করা যাবে না। সঙ্গত কারণে এসব অটোরিকশার কারণে আমাদের পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের দেশে যে প্রতিষ্ঠিত ব্যাটারি উৎপাদনকারীরা রয়েছে তারা মানদ- মেনে ব্যাটারি পুনঃব্যবহারযোগ্য করে তোলে। কিন্তু এদের বাইরে অনেকে রয়েছে যারা ব্যাটারি প্রক্রিয়াকরণে পরিবেশের ক্ষতিকর দিকগুলো আমলে নেন না। ব্যাটারির ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের দিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

দূষণের ফলে কী হচ্ছে : ইউনিসেফের গবেষণা বলছে, সিসা একটি শক্তিশালী স্নায়ুবিষ। অল্প মাত্রায় সিসার সংস্পর্শও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রক্তে সিসার মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার হলে আক্রান্ত শিশুর আইকিউ অন্য শিশুদের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ বা তারও বেশি পয়েন্ট কমতে পারে। অর্থাৎ সিসা দূষণের ফলে শিশুর যুক্তি, সমস্যা সমাধান, স্মৃতি, চিন্তা ও শেখার ক্ষমতা কমে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের আইকিউ কমে যাওয়ার অর্থ শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে শিক্ষা, কর্মদক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ আয়ক্ষমতার ওপর। এর সামষ্টিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে গিয়ে পড়ে।

জানতে চাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেশের প্রবীণ চিকিৎসক ডা. অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, সিসার সবচেয়ে বড় প্রভাব হচ্ছে এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শিশুর গর্ভাবস্থায়। অনেক সময় শ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করে শিশুর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা হয়। নিউমোনিয়া এবং রক্তশূন্যতার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া সিসায় শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বিলম্বিত হয়।

লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি নিয়ন্ত্রণ করা কেন কঠিন : লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির বিকল্প হতে পারে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রাথমিক বিনিয়োগ। একটি অটোরিকশার এক সেট লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির দাম ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজারের মধ্যে। অন্যদিকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির দাম দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকার মধ্যে। তবে একটি লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির আয়ুষ্কাল এক থেকে দুই বছর, অন্যদিকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আয়ুষ্কাল ৪ থেকে ৮ বছর। তবে একজন অটোরিকশার চালক বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাশ্রয়ের চিন্তা করবে। একটি সাধারণ অটোরিকশা এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। সেখানে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অটোরিকশার দাম দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। জার্মান সরকারের মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (জিআইজেড) লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। জিআইজেডের একজন গবেষক জানান, আর্থিক বিষয়টি একটি বড় সমস্যা হলেও রাজশাহীসহ কিছু এলাকায় তাদের উদ্যোগে তরুণরা এই ব্যবসায়িক মডেলে সাড়া দিচ্ছেন। তবে তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

সরকার কী করছে : সারা দেশে কত অটোরিকশা আছে এর সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই সরকারের কাছে। সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি নিয়ন্ত্রণ সেখানে অনেক দূরের বিষয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি জানিয়েছেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে একটি নীতিমালা করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন, সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এ সংশ্লিষ্ট কিছু ধারা ও তফসিল ইতিমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে। তবে এই নীতিমালা করার কথা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই বলা হচ্ছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকার একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিও গঠন করে। যেখানে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। তবে এর কোনো নীতিমালায় অটোরিকশার সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি নিয়ন্ত্রণের বিষয় আদৌ থাকবে কি না তা নিশ্চিত করা হয়নি।