আহমদ রফিকের প্রথম প্রয়াণবার্ষিকীতে স্মরণাঞ্জলি

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের প্রথম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণাঞ্জলি অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪০১ নম্বর কক্ষে সন্ধ্যা ৬টায় খামখেয়ালী সভার আয়োজনে ‘মহিমা তব উদ্ভাসিত’ শীর্ষক এ স্মরণাঞ্জলি অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খামখেয়ালী সভার অন্যতম ট্রাস্টি ও চিত্রশিল্পী আবদুল মান্নান।

স্মরণাঞ্জলিতে আহমদ রফিকের জীবন ও রচনা নিয়ে আলোচনা করেন লেখক ও গবেষক মফিদুল হক, অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী, আহমদ রফিক ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ড. ইসমাইল সাদী এবং খামখেয়ালী সভা ট্রাস্টের সভাপতি মাহমুদ হাশিম। এ সময় আহমদ রফিকের ‘মাকে আমি কোনদিন’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষ চিঠি’র অংশবিশেষ আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়।

অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী বলেন, আহমদ রফিক ব্যক্তিগত সম্পদে আস্থা রাখতেন না এবং সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানায় বিশ্বাস করতেন না। তার স্মরণে বর্তমানে আহমদ রফিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তিনি এ উদ্যোগের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তবে তার শেষ ইচ্ছা ছিল, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর স্মরণে তরুণদের উদ্যোগে একটি ফাউন্ডেশন বা সংগঠন গড়ে উঠবে এবং আলাউদ্দীন খাঁর সাধনার চর্চা হবে। ভীষ্মদেব চৌধুরীর বক্তব্যে আহমদ রফিকের স্বার্থহীন মানসিকতার বিষয়টি উঠে আসে।

ইসমাইল সাদী বলেন, আহমদ রফিক কখনো নিজের কাজ বা অবদানের প্রচার করেননি। এ কারণে তার জীবনের অনেক ঘটনাই আড়ালে থেকে গেছে। তার কর্মময় জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থ প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

লেখক ও গবেষক মফিদুল হক বলেন, আহমদ রফিক সবসময় নিজেকেই অতিক্রম করে গেছেন। বাঙালির চিরায়ত অসাম্প্রদায়িকতার রূপ তার মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। তার মতে, আহমদ রফিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আইকন হতে পারেন।

স্মরণাঞ্জলিতে আহমদ রফিককে ঘিরে চারটি কর্মসূচি ঘোষণা করে খামখেয়ালী সভা। এর মধ্যে রয়েছে ‘আহমদ রফিক সংগ্রহ’। এর আওতায় খামখেয়ালী সভার রবীন্দ্র গ্রন্থাগারে তার রচনা সংগ্রহ ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হবে।

এ ছাড়া রয়েছে ‘আহমদ রফিক স্মারক বক্তৃতা’ এবং ‘ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক অধ্যয়নসভা’। ছয় মাস মেয়াদি এ কোর্স চলতি নভেম্বরেই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে কোর্সটির জন্য সদস্য আহ্বান চলছে। পাশাপাশি রবীন্দ্র গবেষকদের জন্য ‘আহমদ রফিক গবেষণা বৃত্তি’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির ঘোষণা দেন খামখেয়ালী সভা ট্রাস্টের সভাপতি মাহমুদ হাশিম।

স্মরণাঞ্জলির সভাপতি চিত্রশিল্পী আবদুল মান্নান বলেন, আহমদ রফিকের স্মৃতি রক্ষা ও তার চর্চা অব্যাহত রাখতে প্রস্তাবিত পরামর্শগুলো নিয়ে কাজ করবে খামখেয়ালী সভা। অনুষ্ঠানে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে খামখেয়ালী সভা বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি। এ কাজে আহমদ রফিক ফাউন্ডেশনসহ উপস্থিত লেখক, সাহিত্যিক, প্রকাশক ও আহমদ রফিক অনুরাগীদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

উল্লেখ্য, রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রবীন্দ্রচর্চায় পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন আহমদ রফিক। নানা কারণে একসময় রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের কার্যক্রম আর চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তার গভীর দুঃখ ছিল।

তারুণ্যনির্ভর খামখেয়ালী সভার কার্যক্রমে আহমদ রফিক সন্তুষ্ট ছিলেন। ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর খামখেয়ালী সভা তাকে প্রথম রবীন্দ্রগুণী সম্মাননা দেয়। আমৃত্যু তিনি খামখেয়ালী সভার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ছিলেন অন্যতম। ছাত্রজীবনে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করলেও তিনি আমৃত্যু দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিন শতাধিক গ্রন্থে তিনি দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মননজগত তুলে ধরেছেন।