প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে উৎসবের সুর বিশ্বসাহিত্য প্রাঙ্গণে

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩২ পিএম

বাংলার ঢাক, চাকমা নৃত্য, জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় পাখি দোয়েল, ভরত নাট্যম, বই শুধু বই, বাদ্যযন্ত্রীর দল, জনপ্রিয় চরিত্র, মণিপুরী নৃ্ত্য, মুক্তিযুদ্ধ, মাছ ধরার দল, বিয়ের দল, সাপুড়ে নৃত্য, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মারমা নৃত্য, লাঠি খেলা, বাংলার ঢাক, সহযোগী প্রতিষ্ঠান, পতাকাবাহী দল ও ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির বৈচিত্র্যতা নিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। যার সম্মুখ সারিতে আলোকিত মানুষ গড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। যিনি স্বপ্ন দেখেছেন বইয়ের সুবাস সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে। সেই আলোর সংগঠন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪৫তম বর্ষ উদযাপনের এত আয়োজন।

শুক্রবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে ওঠার পর্যায় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সদস্য, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীসহ সমাজের বিশিষ্টজনরা এতে অংশ নেন। শোভাযাত্রাটি বাংলামোটরের ময়মনসিংহ রোডের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সামনে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ফরিদুর রেজা সাগর ও শাইখ সিরাজসহ অন্যান্য অতিথিরা। জাতীয় ও গ্রামীণ অনুষঙ্গসহ বিভিন্ন থিমের ওপর ভিত্তি করে মোট ২৩টি অংশে বিভক্ত ছিল শোভাযাত্রাটি।

৪৫ বছর পূর্তিতে ময়মনসিংহ রোডসহ পুরো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবন সাজানো হয়েছে মনোমুগ্ধকর সাজে। সড়ক ও দেয়ালে আঁকা হয়েছে আলপনা। আলোকচিত্রে এই ৪৫ বছরের যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে একটি প্রদর্শনীতে। এ ছাড়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে বর্ণিল রূপে সাজানো হয়েছে। দিনব্যাপী আয়োজনে চলছে দেশাত্মবোধক গান-নাচ, বাউল সংগীত ও আলোচনা। যার মধ্য দিয়ে পুরো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে প্রাণের সঞ্চার দেখা গিয়েছে। কেউ সেলফি তুলতে ব্যস্ত, কেউ পুরনো বই পড়ার সঙ্গীর সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত।

১৯৭৮ সালে ৩৫ টাকায় কেনা ১০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু। আজ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের গ্রন্থাগারে রয়েছে ১০ লাখেরও অধিক বই। যে বইগুলো লাইব্রেরিতে বসে সরাসরি পড়তে পারেন পাঠকরা। এ ছাড়া বিক্রয়কেন্দ্রে বইয়ের সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। যেখান থেকে পাঠকরা চাইলে বই কিনতে পারেন। ১৯৭৮ সালের শুরু হওয়া পথচলায় সভ্য ছিলো ১৫ জন। আজ সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখে। সংখ্যার বিচারে নয় ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি আলো ছড়াচ্ছে দেশজুড়ে।

যে আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। ইন্টারনেটে আসক্ত যুব সমাজকে বইমুখী করতে বছরজুড়ে থাকে নানা আয়োজন। স্কুলের খুদে শিক্ষার্থীদের বই পড়ায় আগ্রহ তৈরিতে আয়োজন করে বই পড়া প্রতিযোগিতার। এ ছাড়া নামমাত্র টাকায় ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সদস্য হয়ে শিক্ষার্থীরা ভিন্নধর্মী বই পড়ার সুযোগ পায়। এমনকি পছন্দের বইটি পুরো সপ্তাহজুড়ে পড়ার সুযোগও রয়েছে। এতসব আয়োজন মানুষের মনে বিদ্যার আলো পৌঁছে তাকে আরো প্রজ্বলিত করার নিমিত্তে।

১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি আজ বিশাল মহীরূপে রূপ নিয়েছে। ঢাকা কলেজের ছোট মিলনায়তন ঢাকার বাংলামোটরে রূপ নিয়েছে নয় তলাবিশিষ্ট ভবনে। প্রায় ৫৭ হাজার বর্গফুট জুড়ো আছে সমৃদ্ধ পাঠাগার, চিত্রশালা, মিলনায়তন, সংগীত ও চলচিত্র আর্কাইভ, অতিথি কক্ষ, বই বিক্রয়কন্দ্রেসহ বই পড়ার সুবিধা। ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকেই বই পড়ার উৎসাহ পেয়েছে মেহেদি রাফি। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষার্থী। মেহেদি জানান, ক্যাম্পাসের বটতলায় একদিন জটলা দেখতে পান। কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে যান দেখতে। সেখানে কোনো মারামারি বা তর্ক-বিতর্ক নয়, গিয়ে দেখেন সবার হাতে বই। একটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ঘিরে এই জটলা। ইন্টারনেট, মোবাইলের যুগে সবার হাতে বই দেখে নিজের অজান্তেই আগ্রহ জন্মায় তার। এভাবে বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রের সঙ্গে পথ চলা শুরু করেন রাফি।

মেহেদি রাফি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বই পড়ার আগ্রহটি মনের মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থাতেই ছিল সম্ভবত। সেদিন প্রথম যেদিন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ঘিরে রাখা শিক্ষার্থীদের হাতে বই দেখতে পাই সেদিন এই আগ্রহটি জেগে ওঠে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত সাহিত্য কেন্দ্রের এই লাইব্রেরি থেকে শ’ খানেক বই পড়ে ফেলেছি।

এরকম স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া লাখো শিক্ষার্থীকে বই পড়ার সুযোগ করে দিয়ে যাচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। আলোকিত মানুষ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে তারা আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে শহর থেকে গ্রামে। 

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র: স্বপ্ন ও বাস্তব শীর্ষক এক প্রবন্ধে বলেছেন, ১৯৬৮ সালে আমি একটা পাঠচক্র শুরু করি। আমার তখন মনে হয়েছিল, আমাদের জাতির জ্ঞানের এলাকা একেবারেই নিঃস্ব। জাতির ভেতর জ্ঞান দরকার। ঢাকা কলেজের কিছু মেধাবী ছেলেকে নিয়ে শুরু হয়েছিল পাঠচক্রটা। কিছুদিন চলেছিলও ওটা, কিন্তু ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ডামাডোলে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। সারা দেশে যে বিদ্রোহের ক্ষোভ প্রজ্বলিত হয়ে উঠল, তার মুখে সেই পাঠচক্র যে কোথায় ভেসে গেল, খুঁজেও পেলাম না।

১৯৭৮ সালে আবার নতুন করে শুরু হলো পাঠচক্র। এই পাঠচক্র পাঁচ বছর চলার পর বুঝলাম আমাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি। বহুমুখী জ্ঞান ও জীবনচর্চার ভেতর দিয়ে ছেলেমেয়েদের মনের অচিন্তিত বিকাশ ঘটেছে। বুদ্ধিদীপ্ত, ক্ষুরধার আর সম্পন্ন হয়ে উঠেছে তারা। সেই পাঠচক্রে ২০ জন ছেলেমেয়ে ছিল। তাদের প্রায় সবাই আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রের নেতৃত্বে। এভাবেই যাত্রা শুরু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের। মাত্র ৩৫ টাকায় ১০টি বই কিনে ১৯৭৮ সালে শুরু হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ১৫ জন সভ্য নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আজ সভ্য ১৫ লাখ।

২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় আছে দশ লাখের অধিক বই। গত বছরে ১৫ হাজার পাঠক-পাঠিকা এ গ্রন্থাকার থেকে বই পড়েছেন। শুধু পাঠাগারেই নয়, এখান থেকে বই বাড়িতে নিয়ে পড়ারও সুযোগ আছে। দেশে ভালো গ্রন্থাগার ব্যবস্থার অভাব বোধ থেকেই ১৯৯৯ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চালু করে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার। এই ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার প্রতি সপ্তাহের নির্ধারিত সময়ে শহর ও গ্রাম মিলিয়ে ৬৪টি জেলায় গিয়ে আধঘণ্টা থেকে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সদস্যদের মধ্যে বই দেওয়া-নেওয়া করে। স্কুল-কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তা বিস্তৃত। দেশের ৬৪টি জেলার ২৫০টি উপজেলার তিন হাজার লোকালয়ে তা ছড়িয়ে পড়েছে। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিতে বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা ৪ লাখ ৩০ হাজার। আর দেশজুড়ে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সদস্য সংখ্যা ৩০ লাখ। এ ছাড়া আলোর ইশকুল, আলোর পাঠশালা, প্রাথমিক শিক্ষকদের বইপড়া কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে সংগঠনটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত