নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা

শৃঙ্খলায় ফিরুক, নীতিমালায় চলুক

রাজধানী ঢাকা তো বটেই, প্রতিটি নগরে-শহরে এমনকি উপজেলায় পর্যন্ত শৃঙ্খলা ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। দেশ রূপান্তরে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রাজধানীতে অটোরিকশার কারণে সৃষ্ট বহুমাত্রিক নেতিবাচক চিত্র। পরিবেশ, কর ফাঁকি, দুর্ঘটনা, অপরাধ, গ্যারেজকেন্দ্রিক মাদক সিন্ডিকেট ও জ¦ালানি সংকটের কঠিন সময়ে ব্যাটারি চার্জের প্রয়োজনে বিদ্যুৎ শুষে নেওয়ার জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়সহ এর বিরূপ প্রভাবের শেকড় সন্ধান হয়েছে ওই ধারাবাহিকে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই বাহনটি বড় একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে বটে, কিন্তু নিয়মনীতির বালাইহীন এমন পরিস্থিতির বিপরীত অবস্থা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর ঔদাসীন্য নিয়েও আমরা প্রশ্ন উত্থাপন করি। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে অটোরিকশার চলাচল থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে নৈরাজ্যের চিত্র উঠেছে তা তো একদিনে সৃষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিকতার যে ব্যত্যয় ঘটে চলেছে এর দায় কি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারেন?

নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অতিরিক্ত চলাচল ও বেপরোয়া গতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে তীব্র যানজট, বিশৃঙ্খলা ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রকট করে তুলেছে। অধিকাংশ অটোরিকশা ও ইজিবাইক অননুমোদিত এবং স্থানীয়ভাবে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি। চালকদের বড় একটি অংশের ট্রাফিক আইন ও চালনার ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। অনুমোদনহীন গ্যারেজে অবৈধভাবে ব্যাটারি চার্জ করার ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপের নেতিবাচক প্রভাব বহুমুখী হয়ে পড়ছে। রাজধানীর ভিআইপি রোড কিংবা অলিগলি কোথাও না কোথাও অটোরিকশার কারণে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা। ভেঙে পড়েছে ট্রাফিক ব্যবস্থা। বুয়েটের তৈরি উন্নত অটোরিকশার মডেলটি অনুমোদনের পর পাইলট প্রজেক্ট চালু হয় দক্ষিণ সিটির জন্য ঝিগাতলা এবং উত্তর সিটির জন্য আফতাবনগর এলাকায়। কিন্তু আইনগত জটিলতায় আটকে যায় বুয়েটের তৈরি মডেলটি।

রাজধানীতে তো বটেই, মফস্বলেও ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অটোরিকশা ও ইজিবাইক তৈরির কারখানা। এগুলোর নেই কোনো কাঠামোগত ভিত্তি। ফলে এগুলো জনবাহনের বদলের জনঝুঁকির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইসেন্সবিহীন চালক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আমরা মনে করি, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি কল্যাণমুখী নীতিমালা প্রয়োজন। এতে সবাই উপকৃত হবে এবং দুর্ঘটনা কমে আসবে। একই সঙ্গে এও আমলে রাখতে হবে, যারা জীবিকার তাগিদে এ পথে পা রেখেছে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানেরও। দেশের অনেক নগরে-শহরে পর্যাপ্ত গণপরিবহন নেই। স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতেও মানুষকে প্রায়ই ব্যক্তিগত যানবাহন বা ব্যয়বহুল পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে অটোরিকশা অপেক্ষাকৃত কম খরচে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করেছে। এই বাহনকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসাও গড়ে উঠেছে। আসছে বড় বিনিয়োগও।

কাজেই এক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে, অনিয়ম ঠেকাতে, নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলাসহ অটোরিকশাকেন্দ্রিক সৃষ্ট বিদ্যমান বহুমুখী জটিলতা নিরসনে চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, যানবাহনের মান এবং ট্রাফিক আইন মানার বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করে এর ব্যবস্থাপনাগত কাঠামো তৈরি সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। একটি মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হয়। রয়েছে গাড়ির নিবন্ধন, কর, ফিটনেসসহ বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নীতির অসামঞ্জস্যতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, এর দায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদেরই নিতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, অনেকের একক জীবিকার বাহন হলেও কোথাও কোথাও অটোরিকশা বৃহত্তর পরিসরে আর্থিকভাবে অনেক সক্ষম ব্যক্তির কাছে তা ব্যবসায়িক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একজন মালিকের কয়েকটি অটোরিকশা বা ইজিবাইকও আছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা চালকদের নিজেদের লাভের অঙ্ক কষে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক নিবন্ধনব্যবস্থা চালু, চলাচলের ক্ষেত্র ও নিয়ম-বিধি নিশ্চিত করা জরুরি। চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অবগত করতে হবে। পরিবেশের সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি  বিদ্যুৎ খরচের ব্যাপারে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি প্রকট হয়ে উঠেছে এরও আইনানুগ প্রতিবিধান বাঞ্ছনীয়। শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিতে হবে নির্মোহ অবস্থান। সব মিলিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল ও নীতিনির্ধারকদের সামনে এ ব্যাপারে যে চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান এর সুরাহা তাদেরই করতে হবে দ্রুত। সমন্বয়ের ভিত্তিতে এর সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।