‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ সংকলনের কাজে যুক্ত হওয়ার স্মৃতি আজ অন্যভাবে ফিরে আসছে। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর খবর শোনার পর মনে হচ্ছে, যে কাজের অংশ হয়েছিলাম, তার পেছনের মানুষটিকে নিয়ে আরও কিছু কথা বলা দরকার। ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ সংকলনের কাজে যুক্ত বারোজনের দলের একজন হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা সীমিত। তবু সেই অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, ইতিহাসের একটি সংকলন প্রকাশের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পাদকের নিজের অবস্থানও জড়িয়ে থাকে। কী প্রকাশ করবেন, কোন বিষয়ে সময় দেবেন, পাঠকের হাতে কী পৌঁছানো প্রয়োজন মনে করবেন, এসব সিদ্ধান্তেই তার দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের তিন খণ্ডে প্রকাশিত ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ আমার কাছে সেই সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের একটি উদাহরণ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লেখককে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হয়। স্মৃতির সঙ্গে দলিলের মিল খুঁজতে হয়, ঘটনার বিবরণে মানুষের অভিজ্ঞতাকেও জায়গা দিতে হয়। সম্পাদকের দায়িত্ব সেই কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা। প্রকাশনার আকারের চেয়ে আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে এই দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত। খালিদী ভাই সেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আমরা তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম।
সংকলনটি এমন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে প্রকাশ্য অস্বীকার ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা আমাদের উদ্বিগ্ন করছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সমতুল্য করে উপস্থাপনের চেষ্টাও চলছিল। দুটি ঘটনার নিজস্ব সময়, উদ্দেশ্য ও ঘটনাপ্রবাহ আছে। একটির গুরুত্ব বোঝাতে অন্যটির চরিত্র মুছে দিলে ইতিহাসের পাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের জন্মের ঘটনাগুলো সম্পর্কে পাঠকের জানার অধিকার আছে। সেই অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে তথ্যনিষ্ঠ প্রকাশনা পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া একজন সম্পাদকের দায়িত্ব। ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ নিয়ে ভাবতে গিয়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর এই সিদ্ধান্তের মূল্য অনুভব করেছি। ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকবে, নতুন দলিল পাওয়া যাবে, পুরনো ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হবে। এসব আলোচনার জন্য পাঠকের হাতে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। রাজনৈতিক সুবিধামতো ঘটনার বিবরণ বদলে দিলে সেই আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয়। সংবাদমাধ্যম এখানে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারে। সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি দলিল, গবেষণা ও স্মৃতিচারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের অভিজ্ঞতা যত যতœ নিয়ে সংরক্ষিত হবে, পরবর্তী প্রজন্ম তত বেশি পড়ার সুযোগ পাবে। বিডিনিউজের মতামত পাতায় লেখার সুবাদেও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে আমার যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল। সেখানে কর্মরত ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ থেকেও তার সম্পাদকীয় অবস্থান সম্পর্কে জেনেছি। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধার সঙ্গে এই অভিজ্ঞতাগুলো যুক্ত। তার কাজ সম্পর্কে সবকিছু জানার সুযোগ আমার হয়নি। যতটুকু জেনেছি, তার মধ্যে সংবাদকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সাংবাদিকের কাজের পাশে থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে মনে আছে। একজন সম্পাদকের মূল্যায়নে ব্যক্তিগত সৌজন্যের সঙ্গে তার পেশাগত সিদ্ধান্তগুলোও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। পাঠকের জীবনে সেই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ে। কোনো খবর প্রকাশের পর ক্ষমতাবান মানুষ অসন্তুষ্ট হতে পারেন। সম্পাদকের পরিচিত কারও স্বার্থও তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন সংবাদটির তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং জনস্বার্থের গুরুত্ব সম্পাদকের বিবেচনায় থাকা দরকার। সংবাদকে নিজের সম্পর্কের হিসাব থেকে দূরে রাখার কাজ প্রতিদিন করতে হয়। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সম্পাদকীয় অবস্থান সম্পর্কে শোনা কথাগুলো আমাকে এই দায়িত্বের কথাই ভাবিয়েছে।
বার্তাকক্ষের স্বাধীনতা রক্ষায় সম্পাদকের দায়িত্ব আছে। সাংবাদিক অনুসন্ধান করবেন, তথ্য যাচাই করবেন, ক্ষমতাবানদের কাছে জবাব চাইবেন। তার কাজে ভুল থাকলে সম্পাদক তা ধরিয়ে দেবেন, সংশোধনে সহায়তা করবেন। তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা শেষে প্রতিবেদন প্রকাশের দায়িত্বও নেবেন। সেই প্রতিবেদন নিয়ে চাপ এলে সাংবাদিকের পাশে দাঁড়াবেন, তাকে একা সামলাতে দেবেন না। সম্পাদক পাশে থাকলে কাজের আস্থা তৈরি হয়। সেই আস্থার সঙ্গে সতর্কতার দায়িত্বও থাকে। আমার বন্ধুর সঙ্গে আলাপে খালিদী ভাই সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছি, সেখানে তথ্যের মান বজায় রেখে সাহসের সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একটি বক্তব্যের সঙ্গে পাঠকের দ্বিমত হতে পারে। কিন্তু বক্তব্যটি স্পষ্ট, তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং যুক্তি অনুসরণযোগ্য হওয়া জরুরি। লেখাকে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য করতে সম্পাদক ও লেখক একসঙ্গে কাজ করেন। কোন কথায় অযথা পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, কোথায় তথ্য অসম্পূর্ণ, কোথায় বক্তব্য আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন, এসব বিষয়ে মনোযোগ লেখাটিকে পাঠকের উপযোগী করে। বিডিনিউজে লেখার অভিজ্ঞতা আমার কাছে তাই ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। সম্পাদকের দায়িত্বের আলোচনা শুধু শোকের দিনে সীমিত থাকলে চলবে না। পাঠক কোন তথ্য পেলেন, কোন তথ্য অপ্রকাশিত থাকল, একটি অভিযোগের জবাব নেওয়া হলো কিনা, এসবের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা জড়িত। একজন সম্পাদককে স্মরণ করার সময় তার কাজের এই দিকগুলো নিয়েও কথা বলা দরকার।
শোকের মধ্যে খালিদী ভাইকে মনে করতে গিয়ে তার নেওয়া কাজগুলোর কথাই সামনে আসছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার নিয়ন্ত্রণ এখন অন্য হাতে। তাদের স্বার্থরক্ষায় সাংবাদিকদের ব্যবহার করা হয়। খালিদী ভাই তার সাংবাদিকদের এমন চাপ থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি অনন্য। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রত্যাশা রাখি, প্রতিটি সংবাদমাধ্যম সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে জনস্বার্থে কাজ করতে দিক। পাঠকের কাছে সত্য পৌঁছানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী