গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষী দিতে হাজির না হওয়ায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনসহ দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত বিভিন্ন পদমর্যাদার অন্তত ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। এর মধ্যে অধিকাংশ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে রয়েছে অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। গত শনিবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (সদর) এর দপ্তর থেকে ১৮টি পৃথক স্মারকে চট্টগ্রামসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো চিঠি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সিএমপির ডিসি হেডকোয়ার্টার স্বাক্ষরিত এসব চিঠিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ইউনিট প্রধানকে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার চলতি অক্টোবর ও আগামী নভেম্বর মাসের বিভিন্ন তারিখে (চিঠিতে উল্লেখ আছে) সাক্ষ্য প্রদানের দিন ধার্য আছে। ধার্য তারিখে সকাল ৯টার মধ্যে সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রদানের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করার জন্য অনুরোধ করা হলো। আদালত কর্তৃক সাক্ষীদের প্রতি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু আছে। ধার্য তারিখে উল্লিখিত সাক্ষী হাজির না হলে এবং সে কারণে সাক্ষীর অভাবে রাষ্ট্রপক্ষের মামলার ফলাফল বিপর্যয় ঘটলে এর দায়দায়িত্ব সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পুলিশ সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে বিপুলসংখ্যক ফৌজদারি মামলার বিচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে পুলিশ অনুপস্থিত থাকায় মামলার ম্যারিট দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এদিকে একাধিক পুলিশ সাক্ষী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানিয়েছেন, তারা সিএমপিসহ দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটের রিজার্ভ অফিসের ‘সমন শাখার’ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে যথাসময়ে সমন পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ সাক্ষীর কাছে সমন পৌঁছানোর বিষয়ে উদাসীনতা আছে তদারক কর্মকর্তাদেরও।
এ প্রসঙ্গে সিএমপির উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল বলেন, যেসব পুলিশ সদস্য দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আছেন তারা তো আদালতে আসার জন্য ভাতা সুবিধা পান। কিন্তু যেসব পুলিশ সাক্ষী অবসরে গেছেন বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন তারা মামলার ধার্য তারিখে আদালতে আসার ভাতা বা যাতায়াত খরচ পান না। আবার রিজার্ভ অফিসে পুলিশ সাক্ষীর সমন পাঠানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের ‘বিপি নম্বর’ থাকে না। এ জন্য সাক্ষীর কর্মস্থল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সিএমপির সমন শাখার গাফিলতি আছে কি-না সে বিষয়ে আমার জানা নেই।
তথ্যসূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে সিএমপি এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হওয়া বিভিন্ন পদমর্যাদার অনেক পুলিশ সদস্য মামলার ধার্য তারিখে সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হচ্ছেন না। এছাড়া শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সিএমপির বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করা মো. মহসীন, প্রণব চৌধুরীসহ অন্তত এক ডজন পুলিশ পরিদর্শকের হদিস নেই বলেও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সংশ্লিষ্ট আদালতে সাক্ষী হাজির না হলে মামলার ম্যারিট দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত আদালতে মামলাজট কমাতে কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে পুলিশ সাক্ষী হাজির করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা রুটিন ওয়ার্ক। সিএমপির একটি থানার ওসি বলেন, আদালতে সাক্ষী হাজিরের দায়িত্ব থানা পুলিশের। আদালত থেকে আসার পর রেজিস্ট্রারে সমন লিপিবদ্ধ করতে প্রতিটি থানায় একজন পুলিশ সদস্য থাকেন। কিন্তু উক্ত থানার ওসি বা তদূর্ধ কর্মকর্তাদের তদারকির অভাবে যথাসময়ে সমন তামিল করা হয় না। এমনকি থানার রেজিস্টারে ভুয়া তামিল দেখানো হয়।
এর আগে বিচারাধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সাক্ষ্য না দেওয়ায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তিন শতাধিক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালত। এই পুলিশ সদস্যদের বেশিরভাগই একসময় চট্টগ্রাম মেট্রেপলিটন পুলিশের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও জেলার বাইরে পুলিশের বিভিন্ন জোন, থানায় এসব চিঠি পাঠানো হয়েছিল।
একাধিক পুলিশ সাক্ষীর অভিযোগ, রিজার্ভ অফিস, থানা ও পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানরা গুরুত্ব না দেওয়ায় অনেক সময় সমন নোটিস সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পৌঁছানো হলেও দিনের পর দিন সেখানে ফেলে রাখা হয়। ফলে পুলিশ সাক্ষী ধার্য তারিখে আদালতে হাজির না থাকায় বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে।