দেশে ফেরার আকুতি

অভাবের সংসার। একটু সচ্ছলতা আর সুখের আশায় বুক বেঁধেছিলেন গৃহবধূ রেহেনা খাতুন (৩৮)। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভাবের তাড়নায় এক দালালের খপ্পরে পড়ে গৃহকর্মীর ভিসা নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে এখন চরম নির্মমতার শিকার হচ্ছেন তিনি। সৌদি আরবের জেদ্দার আলহাদা এলাকার একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে বন্দি অবস্থায় দিন কাটছে তার। সেখানে নিয়মিত নির্যাতন, ঠিকমতো বেতন-ভাতা না পাওয়া এবং অতিরিক্ত কাজের চাপে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন এই অসহায় নারী। ভুক্তভোগী রেহেনা খাতুন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ২ নম্বর চৌমুহনী ইউনিয়নের কমলপুর গ্রামের কোনাবাড়ী মহল্লার বাসিন্দা। সুদূর প্রবাসে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোপনে একটি ভিডিওবার্তা পাঠিয়েছেন তিনি। সাংবাদিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তার একটাই আকুতিÑ ‘আমাকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নিন।’

রেহেনার পরিবারের অভিযোগ, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর থেকেই তার ওপর শুরু হয় অমানুষিক খাটুনি। দিন-রাত এক করে কাজ করানো হলেও দেওয়া হচ্ছে না কোনো বেতন-ভাতা। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তাকে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না। দেশে ফেরার আকুতি জানালে উল্টো নেমে আসে নানা হুমকি ও ভয়ভীতি। রেহেনাকে মুক্ত করতে এখন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা দাবি করছে সেখানকার চক্রটি।

গত ৩ অক্টোবর শনিবার গোপনে নিজের বর্তমান অবস্থান ও একটি ভিডিওবার্তা দেশে পাঠাতে সক্ষম হন রেহেনা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে রয়েছি। আমাকে নানামুখী চাপ ও কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। আমি খুবই অসুস্থ। মনে হয় বাঁচব না। বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। আমি সরকারের কাছে আকুতি জানাই, আমাকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন।’

রেহেনার স্বামী আলী আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সৌদি দূতাবাসের কাছে আমার আকুল আবেদন, আমার স্ত্রীকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন।’ এদিকে রেহেনাকে সৌদি আরবে পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দালাল হিসেবে গিয়াস উদ্দিনের নাম উল্লেখ করেছে পরিবার। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার মোকন্দপুরের বামুটিয়া গ্রামে। অভিযোগের বিষয়ে গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কিছু খরচাপাতি দিলে তাকে আনিয়ে দেব। সৌদি আরব গেলেই তো আসা যায় না।’

এ বিষয়ে ঢাকার ফকিরাপুলের সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি জেনিয়া ওভারসিসের কর্মকর্তা হাসান মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রেহেনা নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ওই নারী কোনো নির্যাতনের শিকার নন। দেশে ফিরতে হলে আমাদের খরচ দিতে হবে। শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে আমাদের কিছু করার নেই।’ এদিকে রেহেনা খাতুনকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তার স্বামী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের উপসহকারী পরিচালক মালেকা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমাদের কাছে আবেদন এসেছে, আমরা সেটি বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়ে দেখব। উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় চেষ্টা করব।’