ফ্রান্সে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে। যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সরকার। প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের একটি শহরতলীর হাই স্কুলে ধর্মঘটরত শিক্ষকদের সমর্থনে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে এক চরম জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। খবর সিএনএন।
চলমান এই বিক্ষোভে শত শত স্কুল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যাদের পূর্বে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। সংঘাতের ফলে অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লেন্স শহরে একটি গ্রেনেড হাতে তুলে নেওয়ার পর এক শিক্ষার্থী হাত হারিয়েছেন এবং ট্যুরস শহরে অন্য এক শিক্ষার্থী চোখ হারিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেশজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা ব্যানার ও পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে আসেন।
গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের একটি হাই স্কুলে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা শুরুতে খুব একটা মনোযোগ পায়নি। শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বাড়তি কর্মী পাঠানোর আশ্বাস দিলে স্কুলটির ধর্মঘট শেষ হয়, কিন্তু ততক্ষণে আন্দোলনের আগুন অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রনেতা মানেস নাদেল জানান, এরপর আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
প্যারিস ও তার আশপাশের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করতে শুরু করে। কয়েকদিনের মধ্যেই এই চিত্র পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা ময়লার ক্যানে আগুন ধরানো, ব্যারিকেড দেওয়া, শিক্ষকদের ওপর আক্রমণ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের পর থেকে এ পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি হাই স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। আলেনকন শহরে এক পুলিশ কর্মকর্তা এক ছাত্রীর গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরে আটকে রেখেছিলেন, যার ভিডিও প্রকাশ্যে এলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। কারণ এই পদ্ধতিটি ফরাসি আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসছেন। দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা অতিরিক্ত ভিড়, অপ্রতুল সরঞ্জাম এবং শিক্ষক সঙ্কটে জর্জরিত। বছরের পর বছর ধরে যেসব ক্লাসরুমে পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই বা শিক্ষক না থাকায় ক্লাস বাতিল হচ্ছে, সেগুলোর ভিডিও ইন্টারনেটে ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০১০ সালে ফ্রান্সে জন্মহার বাড়ায় বর্তমানে হাই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক বেড়েছে। কিন্তু ২০০৮ সালের তুলনায় এখন শিক্ষকের সংখ্যা অনেক কম, অথচ শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় আড়াই লাখ। বর্তমানে পাবলিক স্কুলের ৭০ শতাংশ ক্লাসরুমে ৩০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, সরকারের পদক্ষেপ ছিল খুব ধীরগতির। শুরুতে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল 'এলএফআই'-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিরোধী নেতা জাঁ-লুক মেলাঁশন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অধিকার এবং সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কথা বলে আসছেন। শুধু প্যারিস অঞ্চলেই স্কুলগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৭৮ লাখ ডলার।
শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথমে কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও পরে তা বাজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়। ছাত্রনেতা মানেস বলেন, সরকারের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণই প্রমান করে শিক্ষার্থীরা কেন এত ক্ষুব্ধ। কারণ তাদের কথা কখনোই শোনা হয় না, সরকার কেবল দমনপীড়ন চালিয়ে জবাব দিচ্ছে।
গত সপ্তাহের শেষের দিকে সহিংসতা হঠাৎ বেড়ে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এটি কেবল ছাত্র আন্দোলন নয়, বরং শহরের সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। কেবল একদিনেই ২,০০০ মানুষকে আটক করা হয়। শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেও কোনো সমাধান আসেনি, ফলে শিক্ষার্থীরা আবারও মঙ্গলবার মহাসমাবেশের ডাক দেয়।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লিকরনু পার্লামেন্টে বলেন, আমাদের হাই স্কুলগুলোর দরজায় চরম সহিংসতা পৌঁছে গেছে এবং এর তীব্র নিন্দা জানানো উচিত। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ২১৫ জন শিক্ষার্থী এবং ৮৫ জন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মী আহত হয়েছেন, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তবে পুলিশকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন।
বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সরকার শিক্ষা খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিতে পারছে না। ২০২৭ সালের বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনার চেষ্টার মধ্যে এই আন্দোলন দেশটির অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলন সরকারগুলোর জন্য সবসময়ই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ১৯৬৮ সালের বিখ্যাত মে মাসের ছাত্র আন্দোলন ফরাসি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধর্মঘটে রূপ নিয়েছিল। তবে বর্তমান আন্দোলনকারীদের দাবি বেশ সাধারণ। তারা বলছেন, তারা অনেক বেশি কিছু চান না, তারা কেবল পড়ালেখার মতো ন্যূনতম একটি উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষা ব্যবস্থা চান।