বাংলাদেশের কৃষি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনের সঙ্গে উৎপাদনের সীমাবদ্ধতাও দ্রুত বাড়ছে। কৃষিজমি কমছে, জলবায়ু পরিবর্তনে খরা, অতিবৃষ্টি, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার চাপ বাড়ছে, মাটির স্বাস্থ্য ক্ষয় হচ্ছে এবং উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বাড়ছে। রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারও মাটি, পানি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতের কৃষিতে লক্ষ্য শুধু বেশি ফলন নয়, কম জমি, কম পানি ও কম উপকরণে অধিক এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন। এই বাস্তবতায় ন্যানোপ্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে সামনে এসেছে। এক মিটারের ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগকে এক ন্যানোমিটার বলা হয়। সাধারণত ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার আকারের কণাকে ন্যানোম্যাটেরিয়াল বলা হয়। অতি ক্ষুদ্র আকারের কারণে এসব পদার্থের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্য প্রচলিত একই পদার্থের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে ন্যানো সার, বালাইনাশক, রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, সেন্সর ও খাদ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি। কিন্তু বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে মূল প্রশ্ন প্রযুক্তি কতটা আধুনিক, তা নয়; প্রশ্ন হলো এটি ক্ষুদ্র কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাবে কিনা, ফলন ও নিরাপত্তা বাড়াবে কিনা এবং নতুন পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করবে কিনা।
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশের দায়িত্ব ক্ষুদ্র উৎপাদকদের ওপর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট খাদ্য উৎপাদকদের ৫৩.৬৫ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক বা ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদক। অথচ তাদের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ৩৩,৬৩৯ টাকা, যেখানে জাতীয় গড় ৭৮,২৮৬ টাকা এবং বড় উৎপাদকদের ১,২৯,৯৫৬ টাকা। অর্থাৎ বড় উৎপাদকদের গড় আয়ের তুলনায় ক্ষুদ্র উৎপাদকদের আয় প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। এই বৈষম্যের বাস্তবতায় ন্যানোপ্রযুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে এর সুফল কতটা পৌঁছায় তার ওপর। প্রযুক্তি আধুনিক হলেই হবে না, তা কৃষকের সাধ্যের মধ্যেও থাকতে হবে। ন্যানোপ্রযুক্তির সাফল্যের প্রথম মাপকাঠি হওয়া উচিত ক্ষুদ্র কৃষকের খরচ কমানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ঝুঁকি কমানো। ন্যানো সারের সম্ভাবনা এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রচলিত সারের একটি বড় অংশ গাছ গ্রহণ করতে পারে না; বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তা মাটি, পানি বা বায়ুমণ্ডলে হারিয়ে যায়। ন্যানো নাইট্রোজেন, ন্যানো জিংক, ন্যানো আয়রন ও ন্যানো সিলিকন নিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে। বাংলাদেশেও ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ছিল প্রায় ৩৫.৮ থেকে ৩৬.৩৪ শতাংশ, যেখানে পরীক্ষিত ন্যানো ইউরিয়া ব্যবস্থায় তা ৫৭.৫৮ থেকে ৭১ শতাংশে উঠেছিল। প্রচলিত ইউরিয়ায় শস্য ফলন ছিল হেক্টরপ্রতি ৬.৪৭ থেকে ৬.৫২ টন আর ন্যানো ইউরিয়া ব্যবস্থায় ৬.৫২ থেকে ৬.৮৪ টন। এমনকি ২৫ শতাংশ কম নাইট্রোজেন দিয়েও কিছু ক্ষেত্রে ফলন না কমার ফল পাওয়া গেছে। তবে গবেষকরাই আরও বড় পরিসরে পরীক্ষার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশের জন্য সার ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর অর্থ শুধু কৃষকের ব্যয় কমানো নয়, জাতীয় অর্থনীতির চাপও কমানো। দেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন সার প্রয়োজন এবং এর ৮০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর। ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সার কারখানাগুলোর উৎপাদন ছিল মাত্র ১১.০৬ লাখ টন, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। গ্যাস সংকট ও কারখানার উৎপাদন সমস্যার কারণে দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম থাকায় আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির বড় অংশ বিদেশ থেকে আনতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ন্যানোপ্রযুক্তি যদি কম সার দিয়ে একই বা অধিক ফলন নিশ্চিত করতে পারে, তবে ক্ষুদ্র কৃষকের উৎপাদন ব্যয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতিও কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে প্রযুক্তির দাম যদি এত বেশি হয় যে, ক্ষুদ্র কৃষক তা কিনতেই না পারেন, তাহলে সার সাশ্রয়ের সম্ভাবনা বাস্তবে অর্থবহ হবে না। তাই ন্যানোপ্রযুক্তির সঙ্গে সাশ্রয়ী মূল্য, সহজ প্রয়োগ ও কৃষকের কাছে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। বালাইনাশক ও স্মার্ট কৃষিতেও ন্যানোপ্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টি, লবণাক্ততা ও রোগজীবাণু শনাক্তকারী সেন্সরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কৃষি আরও তথ্যনির্ভর হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে এই প্রযুক্তি কীভাবে পৌঁছাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। দামি সেন্সর, ড্রোন বা ডিজিটাল ব্যবস্থাকে কৃষকের নিজস্ব বিনিয়োগের ওপর ছেড়ে দিলে বৈষম্য বাড়তে পারে। তাই সমবায়ভিত্তিক সেবা, কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রযুক্তি সরবরাহ কিংবা সেবা হিসেবে প্রযুক্তি ব্যবহারের মডেল বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি। মাটি ও পানির সংকট মোকাবিলাতেও ন্যানোপ্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। ন্যানোম্যাটেরিয়াল দিয়ে মাটির নির্দিষ্ট দূষণ শনাক্ত ও অপসারণ এবং ন্যানোফিল্টারের মাধ্যমে পানি পরিশোধনের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চল, ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষণপ্রবণ এলাকায় ভবিষ্যতে এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বীজের অঙ্কুরোদগম, শিকড়ের বৃদ্ধি ও পুষ্টি গ্রহণেও ন্যানোম্যাটেরিয়ালের প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এর ফলাফল কণার আকার, রাসায়নিক গঠন, ঘনত্ব, প্রয়োগপদ্ধতি ও ফসলের প্রজাতির ওপর নির্ভর করে। একটি ফসলে উপকারী মাত্রা অন্য ফসলে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি অঞ্চলে আলাদা মাঠ পরীক্ষা এবং প্রযুক্তির কার্যকারিতার পাশাপাশি কৃষকের বিনিয়োগের বিপরীতে আয় কতটা বাড়বে, তা যাচাই করা জরুরি। সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনাতেও ন্যানোপ্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে নষ্ট হয়। ন্যানো প্যাকেজিং, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল আবরণ ও গ্যাস বিনিময় নিয়ন্ত্রণকারী প্যাকেজিং শ্বাসক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, জীবাণু সংক্রমণ কমানো এবং সংরক্ষণকাল বাড়াতে পারে। রপ্তানিমুখী কৃষিতেও এর গুরুত্ব রয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ খাদ্য, গুণগত মান, অবশিষ্টাংশের সীমা, ট্রেসেবিলিটি ও সংরক্ষণকাল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ন্যানো সেন্সর রোগজীবাণু বা দূষক দ্রুত শনাক্ত এবং উন্নত প্যাকেজিং পণ্যের মান ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। ফলে ন্যানোপ্রযুক্তি শুধু মাঠের উৎপাদন নয়, কৃষিপণ্যের পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে আরও দক্ষ করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে সম্ভাবনার এই চিত্রের বিপরীতে ঝুঁকির প্রশ্নটি কঠোরভাবে দেখতে হবে। ন্যানোম্যাটেরিয়ালের অতি ক্ষুদ্র আকারের কারণে পরিবেশে এগুলোর আচরণ, মাটির অণুজীবের ওপর প্রভাব, উদ্ভিদে প্রবেশ ও সঞ্চয় এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে পৌঁছালে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে এখনো অনেক অজানা রয়েছে। অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে ন্যানোকণা মাটি ও পানিতে জমতে পারে, উপকারী অণুজীব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ‘ন্যানো’ শব্দটি কোনো প্রযুক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ করে না; প্রতিটি ন্যানোফর্মুলেশনের ঝুঁকি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকের ক্ষেত্রে প্রমাণিত নয়, এমন প্রযুক্তি বা ভুল প্রয়োগে ফলন কমলে আর্থিক ক্ষতিও বড় হতে পারে। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে প্রয়োজন প্রমাণ আর বাণিজ্যিক ব্যবহারের আগে প্রয়োজন নিরাপত্তা। বাংলাদেশের বিভিন্ন মাটি, পানি, জলবায়ু ও ফসলের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি মাঠ পরীক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ জরুরি। বাংলাদেশে ন্যানোপ্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় গবেষণা, নিয়ন্ত্রণ ও কৃষকের স্বার্থকে একই কাঠামোয় আনতে হবে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও শিল্প খাতের সমন্বয়ে স্থানীয় কৃষি পরিবেশ উপযোগী ন্যানো সার ও বালাইনাশক, মাটি ও উদ্ভিদের স্বাস্থ্য নির্ণয়ের সেন্সর এবং সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমাতে ন্যানো প্যাকেজিং নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ, ফলন, উপকরণ সাশ্রয় ও বিনিয়োগ ফেরতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রযুক্তিকে সাশ্রয়ী, সহজপ্রয়োগযোগ্য ও প্রশিক্ষণসহ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে। ন্যানোপ্রযুক্তি সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার কমানো, পুষ্টি দক্ষতা বাড়ানো, রোগ দ্রুত শনাক্ত করা, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে লক্ষ্য শুধু উচ্চ প্রযুক্তির কৃষি নয়, বরং নিরাপদ, টেকসই, সম্পদ সাশ্রয়ী ও কৃষকের আয় বাড়াতে সক্ষম প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি। তাই ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে অন্ধ আশাবাদ যেমন নয়, তেমনি অযথা ভয়ও নয়। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মূল্যায়ন, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর নীতিমালা ও দায়িত্বশীল প্রয়োগ। সঠিক পরিকল্পনা ও গবেষণার মাধ্যমে ন্যানোপ্রযুক্তি দেশের কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, দক্ষ, নিরাপদ ও রপ্তানিমুখী করার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। তবে সম্ভাবনার এই নতুন দুয়ার খুলতে হবে সতর্কতার সঙ্গে। কারণ কৃষিতে প্রযুক্তির শক্তি যত বড়, তার দায়বদ্ধতাও তত বেশি ।
লেখক : কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
rssarker69@gmail.com