ভোক্তার কাঁধে চাপের ওপর চাপ

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৩ এএম

গ্যাসের দাম বাড়ার খবর এখন আর কেবল একটি পণ্যের দাম বাড়ার খবর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের রান্নাঘর, একজন শ্রমিকের আয়, একজন চাকরিজীবীর যাতায়াত ব্যয়, একটি ছোট রেস্তোরাঁর হিসাব, একটি পরিবহন মালিকের খরচ এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দাম। অর্থনীতিতে কিছু মূল্যবৃদ্ধি আছে, যা একটি নির্দিষ্ট পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তেমন নয়। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে। ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অক্টোবর মাসের জন্য বেসরকারি এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা নির্ধারণ করেছে, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ১৩২ টাকা ১২ পয়সা। ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা এক লাফে ২৫২ টাকা বেশি। একই সঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও প্রতি লিটারে ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ অটোগ্যাসের দাম বেড়েছে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৬ শতাংশ। নতুন দাম ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে। বিইআরসির ব্যাখ্যা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। অক্টোবরের হিসাবের ক্ষেত্রে সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্য অনুযায়ী প্রোপেন ও বিউটেনের দাম যথাক্রমে ৬৮০ ও ৭৩০ ডলার প্রতি টন ধরা হয়েছে; সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। সঙ্গে শিপিং ব্যয়, ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম এবং ডলারের বিনিময় হারও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই চাপের পুরোটা কি ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দিতে হবে? প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে ওঠে এ কারণে যে, দাম বাড়ার আগেই বাজারে এলপিজির সংকট দেখা দিয়েছিল। সেপ্টেম্বরে সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় সেটি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল। অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে মানুষকে গ্যাস কিনতে হয়েছে। এখানেই মূল সমস্যাটি। দাম বাড়ানো হলো সরবরাহ স্বাভাবিক করার যুক্তিতে; কিন্তু যদি নতুন দাম ঘোষণার পরও বাজারে সরবরাহ ও খুচরা বিক্রিতে শৃঙ্খলা না ফেরে, তাহলে ভোক্তার ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি হবে। একদিকে সরকারি মূল্য বাড়বে, অন্যদিকে বাজারে সেই দামের ওপর আরও ‘অতিরিক্ত মূল্য’ বসবে। আমাদের জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই মূল্য নির্ধারণ আছে, কিন্তু বাজার তদারকির সক্ষমতা দুর্বল; আমদানির হিসাব আছে, কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা সীমিত; ভোক্তার অধিকার নিয়ে কথা আছে, কিন্তু সংকটের সময়ে ভোক্তার হাতে কার্যকর প্রতিকার খুব কম। অটোগ্যাসের ক্ষেত্রেও বিষয়টি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। অটোগ্যাসের দাম বাড়লেই পরদিন বাসভাড়া বা সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া বাড়ানোর কোনো স্বয়ংক্রিয় আইনি যুক্তি তৈরি হয় না। ভাড়া নির্ধারণের নিজস্ব কাঠামো আছে। কিন্তু পরিবহন মালিকদের পরিচালন ব্যয় বাড়লে তারা ভাড়া বাড়ানোর দাবি তুলবেন এটিই বাস্তবতা। সেই দাবি কতটা যৌক্তিক, কতটা অতিরঞ্জিত, সেটি যাচাই করার দায়িত্ব সরকারের। এই মুহূর্তে সরকারের কাজ তাই শুধু নতুন দাম ঘোষণা করা নয়; বাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জ্বালানি ব্যবস্থাপনা’ গড়ে তোলা।

 প্রথম কাজ হওয়া উচিত সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। দেশে কত এলপিজি আমদানি হচ্ছে, কোন কোম্পানি কত আমদানি করছে, কোথায় কত মজুদ আছে, কোন পর্যায়ে সরবরাহ আটকে যাচ্ছে এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমবে। দ্বিতীয়ত, সরকারকে এলপিজির মূল্য নির্ধারণের কাঠামো আরও স্বচ্ছ করতে হবে। আন্তর্জাতিক দাম কমলে দেশে সেই সুবিধা ভোক্তা কত দ্রুত পাচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মূল্যবৃদ্ধির সময় আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলা আর মূল্য কমার সময় নীরব থাকা চলতে পারে না। মূল্য নির্ধারণের সূত্র, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, কর ও ব্যবসায়ীদের মার্জিন সবকিছুর একটি বোধগম্য হিসাব জনসমক্ষে থাকা উচিত। তৃতীয়ত, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দরকার। জ্বালানিতে সবার জন্য ভর্তুকি দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ভালো সমাধান নয়। বরং যাদের প্রকৃত প্রয়োজন, তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে জ্বালানি সহায়তা যুক্ত করা যেতে পারে। চতুর্থত, অটোগ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে যাতে পরিবহন খাতে ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ানো না হয়, সে জন্য সরকারকে ব্যয়ভিত্তিক ভাড়া পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। একটি পরিবহন কত জ্বালানি ব্যবহার করে, প্রতিদিন কত কিলোমিটার চলে, কত যাত্রী বহন করে এসব তথ্যের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব।

সবচেয়ে বড় কথা, সরকারকে জ্বালানি নীতিকে কেবল ‘দাম’ দিয়ে দেখতে হবে না। এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবহন, খাদ্যমূল্য, নগরজীবন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়া হয়তো রাষ্ট্রের মোট অর্থনীতির হিসাবে খুব বড় অঙ্ক নয়; কিন্তু যে পরিবারের মাসিক আয় সীমিত, তার কাছে এই ২৫২ টাকা বাজারের একটি দিনের খাবার, সন্তানের ওষুধ কিংবা যাতায়াতের কয়েক দিনের খরচ। একটি সুশাসিত জ্বালানি বাজারের চূড়ান্ত পরীক্ষা এখানেই। সরকার শুধু দাম নির্ধারণ করবে আর মানুষ সেই দাম মেনে নেবে এটি বাজার ব্যবস্থাপনা নয়। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, দাম বাড়লেও যেন প্রতারণা না বাড়ে, সংকট হলেও যেন মজুদদারি না বাড়ে আর জ্বালানির বাজারের চাপ যেন মানুষের জীবনের ওপর অসহনীয় বোঝা হয়ে না বসে।

লেখক : গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত