মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোনো অংশ বা স্নায়ুকোষ কীভাবে আমাদের স্মৃতি, চিন্তা, ভয় বা অনুভূতির মতো জটিল প্রক্রিয়াগুলোকে পরিচালনা করে, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার মতো প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের হাতে ছিল না। চিরাচরিত পদ্ধতিতে ইলেকট্রিক স্টিমুলেশন বা নানা ধরনের রাসায়নিক ড্রাগ ব্যবহার করে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ বোঝার চেষ্টা করা হতো, কিন্তু সেগুলোতে সুনির্দিষ্ট কোনো স্নায়ুকোষকে আলাদাভাবে লক্ষ্য করা যেত না। বিদ্যুৎ প্রয়োগ করলে নির্দিষ্ট অংশের পাশাপাশি আশপাশের সহস্র স্বাভাবিক নিউরনও অনাকাক্সিক্ষতভাবে উদ্দীপিত হয়ে পড়ত আর রাসায়নিক চিকিৎসায় মিলত ধীর ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া। তবে একুশ শতকের সূচনায় স্নায়ুবিজ্ঞানের এই চিরচেনা সীমাবদ্ধতা ও অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে এক অভাবনীয় বিপ্লবের সৃষ্টি হয়। আর এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ এমন এক অভূতপূর্ব প্রযুক্তি, যা আলোকবিজ্ঞান এবং জিন প্রকৌশলের সুনিপুণ মেলবন্ধনে আলোর মাধ্যমে মস্তিষ্কের জীবন্ত নিউরনকে মিলিসেকেন্ডের সূক্ষ্মতায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী অর্জনের পেছনে মূল রূপকার হিসেবে কাজ করেছেন প্রধানত তিন দূরদর্শী বিজ্ঞানী : পিটার হেগেম্যান, গেওর্গ নাগেল এবং কার্ল ডাইসেরথ।
এই প্রযুক্তির প্রথম ও অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন জার্মান প্রাণরসায়নবিদ পিটার হেগেম্যান। দীর্ঘ গবেষণার এক পর্যায়ে তিনি ক্ল্যামাইডোমোনাস রাইনহার্ডটি নামক এককোষী শৈবালের মধ্যে এক বিশেষ ধরনের আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিনের সন্ধান পান, যার নাম তিনি দেন চ্যানেলরোডোপসিন। হেগেম্যান অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আবিষ্কার করেন যে, প্রোটিনটি একটি চমৎকার জৈব চ্যানেলের মতো কাজ করে। যখনই এই প্রোটিনের ওপর একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে আলো পড়ে, তখনই এটি কোষের ঝিল্লির ভেতরে ও বাইরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম বা ক্যালসিয়াম আয়নের মতো ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণার চলাচলের পথ খুলে দেয়। আয়ন চলাচলের এই আকস্মিক প্রবাহ কোষের ভেতরের বৈদ্যুতিক ভারসাম্যকে পরিবর্তন করে ফেলে। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, এটি কোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপকে বায়োফিজিক্যাল উপায়ে রূপান্তর করার এক অসাধারণ চাবিকাঠি।
পিটার হেগেম্যানের আবিষ্কৃত সেই পথকে ভিত্তি করে গবেষণাকে পরের ধাপে নিয়ে যান জার্মান গবেষক ও বায়োফিজিসিস্ট গেওর্গ নাগেল। হেগেম্যানের আবিষ্কৃত শৈবালের প্রোটিনটি কি কেবল এককোষী জীবের শরীরেই কার্যকর থাকবে, নাকি একে কোনো জটিল বহুকোষী প্রাণীর কোষেও কাজে লাগানো সম্ভব এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছিলেন নাগেল। হেগেম্যানের সঙ্গে যৌথ ও স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে তিনি এক অসাধারণ জৈবপ্রযুক্তিগত সাফল্য অর্জন করেন। নাগেল প্রমাণ করে দেখান যে শৈবাল থেকে পাওয়া ওই নির্দিষ্ট চ্যানেলরোডোপসিনের জিনগত কোডিংকে জিন প্রকৌশলের সাহায্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির যেকোনো স্তন্যপায়ী বা অন্য প্রাণীকোষের ডিএনএতে সফলভাবে স্থানান্তরিত করা সম্ভব। শুধু স্থানান্তর করাই নয়, তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন যে, অন্য কোনো প্রাণীকোষে এই জিন প্রবেশ করানোর পর যখন সেই কোষটি আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি শুরু করে, তখন বাইর থেকে নীল আলো ফেললেই সেই নির্দিষ্ট কোষটির বৈদ্যুতিক কার্যকলাপকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন ও চালনা করা যায়।
তবে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারকে কেবল পেট্রিডিশ ও টেস্টটিউবের ল্যাবরেটরি সীমানা ছাড়িয়ে জীবন্ত প্রাণীর জটিল মস্তিষ্কের ভেতরে বাস্তবায়ন করার মূল দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ডাইসেরথ। নাগেল ও হেগেম্যানের আবিষ্কারকে স্তন্যপায়ীর মস্তিষ্কে কীভাবে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে ২০০৫ সালে ডাইসেরথ তার সহযোগী গবেষকদের (বিশেষ করে এড বয়ডেন) নিয়ে এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা শুরু করেন। মানুষের জটিল মানসিক রোগ ও স্নায়বিক বৈকল্যের স্থায়ী সমাধান খোঁজাই ছিল ডাইসেরথের মূল লক্ষ্য। তিনি জানতেন, মস্তিষ্কের ভেতরের নির্দিষ্ট নিউরনে জিন পৌঁছে দেওয়া একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যার সমাধানে তিনি এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল গ্রহণ করেন। ডাইসেরথ ও তার দল একটি ক্ষতিকারক নয়, এমন বিশেষ ভাইরাসের (Adeno-Associated Virus) ভেতরে চ্যানেলরোডোপসিনের জিনটি যুক্ত করে দেন। সেই ভাইরাসটিকে যখন ইঁদুরের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু নিউরন গুচ্ছে ইনজেক্ট করা হলো, তখন তা আশপাশে থাকা অন্য কোনো সাধারণ কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কেবল কাক্সিক্ষত নিউরনগুলোর ভেতরেই সেই আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করল। এরপর মস্তিষ্কের গভীরে অতিসূক্ষ্ম অপটিক্যাল ফাইবারের তার প্রবেশ করিয়ে যখনই নীল আলোর স্পন্দন ফেলা হলো, দেখা গেল মুহূর্তের মধ্যে নির্দিষ্ট সেই নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠল এবং আলো বন্ধ করা মাত্রই তারা পুনরায় আগের শান্ত অবস্থায় ফিরে গেল। ডাইসেরথ শুধু ইঁদুরের ওপর এই পরীক্ষা সফল করে ক্ষান্ত হননি; তিনি পরবর্তীতে হ্যালোরোডোপসিনের মতো অন্যান্য প্রোটিন ব্যবহার করে হলুদ আলো দিয়ে নিউরনের সক্রিয়তা পুরোপুরি বন্ধ বা ‘সাইলেন্স’ করার পদ্ধতিও বিকাশ করেন। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোনো নিউরনকে চালুর পাশাপাশি বন্ধ করার সুইচেও হাত পড়ে বিজ্ঞানীদের। ডাইসেরথ এই পুরো প্রযুক্তিকে বিশ^জুড়ে সব স্নায়ুবিজ্ঞানীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেন, যা রাতারাতি বিশ^ব্যাপী স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।