আলো দিয়ে মস্তিষ্কের ভাষা পড়া

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০২ এএম

১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া ডাইসেরথ যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৮ সালে স্নায়ুবিজ্ঞানে পিএইচডি এবং ২০০০ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পেশাগত পরিচয় কেবল একজন গবেষকের নয়; তিনি চিকিৎসক হিসেবেও প্রশিক্ষিত। স্ট্যানফোর্ডের মনোরোগ চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট একটি ক্লিনিকে প্রশিক্ষণের সময় এমন রোগীদের অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, যাদের দুর্ভোগ লাঘব করার মতো কার্যকর চিকিৎসা তখন তার হাতে ছিল না। বিশেষ করে মস্তিষ্কের কার্যক্রমের পার্থক্য কীভাবে মানুষের আচরণ ও মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে, সেই প্রশ্ন তার গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হয়ে ওঠে।

তার গবেষণার ক্ষেত্রটি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হয় অপ্টোজেনেটিকস কী। সহজভাবে বললে, এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে জিনগত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কোষকে আলোর প্রতি সংবেদনশীল করে তোলা হয়। এরপর আলো প্রয়োগ করে সেই কোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে সক্রিয় করা বা তার কার্যক্রম বন্ধ করার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করাÑ কোন স্নায়ুকোষ বা স্নায়ুপথ স্মৃতি, অনুভূতি কিংবা কোনো আচরণের সঙ্গে যুক্ত।

এই প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরিতে ডাইসেরথের আগে আরও দুই বিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছিলেন। জার্মান গবেষক পিটার হেগেম্যান ও গেওর্গ নাগেল এক কোষী শৈবালে আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন চ্যানেলরোডপসিনের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেন। ডাইসেরথ সেই প্রোটিনের জন্য দায়ী জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়ে আলোর সাহায্যে কোষের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা দেখান। ২০০৫ সালে ইঁদুরের স্নায়ুকোষে এ পদ্ধতির কার্যকারিতা দেখিয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন। ২০০৭ সালে জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কেও আলো দিয়ে স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা প্রদর্শন করেন।

এরপর থেকে অপ্টোজেনেটিকস স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গবেষকরা এখন নির্দিষ্ট স্নায়ুপথের কার্যক্রম পরিবর্তন করে দেখতে পারেন, তা স্মৃতি, ঘুম, আবেগ কিংবা চলাফেরায় কী প্রভাব ফেলে। ডাইসেরথ নিজেও ইঁদুরের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ সক্রিয় করে তাদের গোঁফের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ এবং ঘুমন্ত ইঁদুরকে জাগিয়ে তোলার মতো পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এসব গবেষণা মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করেছে।

এই প্রযুক্তির চিকিৎসাগত সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ। আলঝেইমার, পারকিনসন, মৃগীরোগ ও আসক্তির মতো সমস্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুপথ নিয়ে গবেষণায় এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। দৃষ্টিশক্তি হারানো কিছু মানুষের রেটিনায় আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহার করে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাও চলছে। তবে গবেষণাগারে কোনো প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়া আর মানুষের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক বিষয় নয়। এসব সম্ভাবনার অনেকটি এখনো গবেষণা ও চিকিৎসা উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে।

বর্তমানে ডাইসেরথ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োইঞ্জিনিয়ারিং এবং মনোরোগ ও আচরণবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত