শনিবার মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হচ্ছে দেবীর আরাধনা

পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের সরু গলির ভেতরের একটি ঘরে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণে ব্যস্ত লিটন পাল। কথা বলার ফুরসত নেই। কাজের ফাঁকে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলছিলেন, ‘এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। দিন-রাত কাজ চলছে।’ গলির ভেতরেই আরেকটি দোকানে পূজার সামগ্রী বিক্রি করছিলেন কৃষ্ণ নাগ। তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা মোটামুটি ভালোই। পূজার সময় যত ঘনিয়ে আসবে, বেচাকেনাও বাড়বে।’

সম্প্রতি সরেজমিন শাঁখারীবাজার, রমনা কালী মন্দির, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ রাজধানীর কয়েকটি মন্দির ও ম-প ঘুরে দেখা যায়, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। কোথাও বাঁশ ও কাঠের কাঠামোয় খড় বাঁধার কাজ, কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ। কোনো কোনো জায়গায় প্রতিমার অবয়ব তৈরির কাজ শেষ করে শিল্পীরা ব্যস্ত রঙ-তুলির শেষ আঁচড়ে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে এই কর্মযজ্ঞ। উৎসব নির্বিঘেœ সম্পন্ন করতে আয়োজকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাও প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। এরই মধ্যে পূজাম-পগুলোয় বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য, তৈরি হচ্ছে উৎসবের আবহ। বিপণিবিতানগুলোয় বেড়েছে পূজায় পছন্দের পোশাক কিনতে আসা মানুষের আনাগোনা।

এক বছর পর দেবী দুর্গা হিমালয়ের কৈলাশ থেকে মর্ত্যে আসছেন ভক্তকে দর্শন দিতে, তাদের পূজা নিতে। সঙ্গে নিয়ে আসছেন তার সন্তান গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে। আগামী কয়েক দিন মন্ত্র ও চ-ীপাঠ, ঢাকের বোল, শঙ্খের আওয়াজ, উলুধনিতে পূজিত হবেন দেবী। দেশজুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের চলছে সেই ক্ষণের প্রস্তুতি।

হিন্দু পুরাণ মতে, অসুর শক্তির কাছে দেবতারা যখন পরাভূত হচ্ছিলেন, স্বর্গলোকচ্যুত হলেন, চারদিকে তখন শুরু হয় অশুভ শক্তির প্রতাপ। সেই অশুভ শক্তিকে পরাভূত করতে একত্রিত হন দেবতারা। দেবতাদের তেজোরশ্মী থেকে আভির্ভূত হন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা। দুর্গাপূজার সঠিক সময় বসন্তকাল হলেও রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। কিন্তু ত্রেতা যুগে শ্রী রামচন্দ্র স্ত্রী সীতাকে রাবণের হাত থেকে উদ্ধারে দুর্গা দেবীর আরাধনার সিদ্ধান্ত নেন। আশি^ন মাসে অকালে দেবী দুর্গাকে জাগ্রত (বোধন) করে রামচন্দ্র পূজার আয়োজন করেন। সেই থেকে আশি^ন মাসে দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। দুর্গা দেবীকে সনাতম ধর্মাবলম্বীরা উমা দেবী, আনন্দময়ী, মহিষাসুর মর্দিনী অন্নপূর্ণা এমন নানা নামে আরাধনা করে থাকেন।

আগামী শনিবার ১০ অক্টোবর মহালয়ার মাধ্যমে এবারের দুর্গোৎসবের প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ১৫ অক্টোবর হবে দুর্গা দেবীর বোধন অর্থাৎ নিদ্রাভঙ্গ। ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় দেবীর অধিষ্ঠান, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের দ্বিতীয় পর্বের আনুষ্ঠানিকতা। মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে মহাসপ্তমীর দিন থেকে। হিন্দু আচার অনুযায়ী, মহালয়া, বোধন

আর সন্ধিপূজা এই তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব। এবার মহাসপ্তমী পড়েছে দুই দিনে। ১৭ ও ১৮ অক্টোবর এ দুই দিন সপ্তমি তিথি। এরপর ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ছয় দিনের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

শাঁখারীবাজারের প্রতিমাশিল্পী পল্টন পাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু প্রতিমায় মাটির প্রলেপের কাজ শেষ করেছি। প্রতিমার চাহিদা আগের মতোই আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমার দামও দিচ্ছেন। তবে এবার প্রতিমা তৈরির খরচ অনেক বেড়েছে। গতবারের তুলনায় এ বছর খরচ প্রায় দ্বিগুণ।

রমনা কালী মন্দিরে দেখা যায়, প্রতিমার মাটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রঙ-তুলির প্রস্তুতি চলছে। এরপর প্রতিমাকে সাজানো হবে। তবে সেখানে থাকা কয়েকজন প্রতিমাশিল্পী নির্ধারিত সময়ের আগেই তাদের কাজ সম্পন্ন হবে বলে তারা আশা করছেন।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত তপন ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী দিয়ে পূজা শুরু হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে তিথির সম্পর্কের কারণে এবার সপ্তমী পূজা দুই দিন ১৭ ও ১৮ অক্টোবর। অষ্টমী, নবমী শেষে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী অনুষ্ঠিত হবে।’

এ বছর দেবীর আগমন ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন হবে নৌকায়। শাস্ত্র মতে, ঘোটকে আগমনের ফলে ছত্রভঙ্গ ও রোগব্যাধির আশঙ্কা থাকে। আর নৌকায় গমনের অর্থ শস্যে সমৃদ্ধির ইঙ্গিত বলে জানান তপন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, মহালয়ার দিন থেকে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের প্রার্থনা নিয়েই আমরা দেবীর আরাধনা করি। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে প্রতিদিন ভোরে পূজা, দুপুরে ভোগ ও প্রসাদ বিতরণ এবং সন্ধ্যায় আরতি অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য মতে, এবার সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজাম-পে পূজা উদযাপন করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা, যা গতবারের চেয়ে প্রায় দেড় হাজার বেশি। এর আগের বছর ম-পের সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৩৫১টি। এবার পূজায় সরকারি ছুটি তিন দিন করা হয়েছে। তবে এর সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার ও শনিবার মিলে মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।

পূজার প্রস্তুতির মধ্যে দেশের অন্তত তিনটি জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এরই মধ্যে বলেছেন, পূজায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার পূজার ছুটি এক দিন বাড়ানোয় মানুষের বেড়ানো ও উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে। সরকারের পক্ষ থেকে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট সতর্কতা ও প্রস্তুতি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ বিষয়ে নিয়মিত বৈঠকও হচ্ছে। ফলে পূজা ঘিরে বড় ধরনের কোনো উদ্বেগ দেখছেন না তারা।