‘মাটির বিস্কুট, ওরে আমার গাঁয়ের ছিকর সোনা/তোর ভেতরের সুবাসখানি সবার চেনা-জানা। উনুন পাড়ে পুড়ল মাটি, পুড়ল কত আশা/পল্লী মায়ের একলা কোণে তুই যে ভালোবাসা। গর্ভধারিণী মায়ের মুখে তুই তো জোগাস স্বাদ/ছিকর কামড় দিলে যেন মানে নামে জোছনা রাত।’ এই কবিতায় সিলেট অঞ্চলের পোড়ামাটির বিস্কুট তথা ছিকরের ঐতিহ্য ও মানুষের আবেগের জায়গাটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এক সময় সিলেট অঞ্চলের ঘরে ঘরে এই বিস্কুট খাওয়ার প্রবণতা ছিল। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের কাছে এই বিস্কুট ছিল অমৃতসম। সত্তর-আশির দশকে পেটের ক্ষুধা নিবারণে অনেক দরিদ্র পরিবারের লোকজন এই বিস্কুট খেতেন। মাটির বিস্কুটের সেই জমজমাট ব্যবসা শূন্যের কোটায় এলেও এখনো মৌলভীবাজারের কিছু অঞ্চলে তা বাজারজাতও করা হয়। শহরের কিছু দোকানে পাওয়া যায় লাল ও কালচে রঙের এই বিস্কুট। দেশের বাজারে এর জনপ্রিয়তা না থাকলেও এটি এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
ছিকর ফারসি শব্দ। ‘ছিয়া’ অর্থ কালো, আর ‘কর’ অর্থ মাটি। এই ‘ছিয়াকর’ শব্দটিই এক সময় ‘ছিকর’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। সত্তরের দশকের শুরুতে হবিগঞ্জে প্রথম ছিকর তৈরির প্রচলন শুরু হয়। পরে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ছিকর তৈরি হয় টিলা বা পাহাড়ের মিহি এঁটেল মাটি দিয়ে। যা বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে আগুনে পোড়ানোর পর তৈরি হয় বিস্কুট। পোড়া ঘ্রাণ ও হালকা টক-মিষ্টি স্বাদের হওয়ায় অনেক নারী গর্ভাবস্থায় ছিকর খেতে খুবই পছন্দ করেন। নব্বই দশক পর্যন্ত এ অঞ্চলে ছিকরের একচ্ছত্র প্রভাব থাকলেও পরে ধীরে ধীরে এর চাহিদা কমতে থাকে। আর এ প্রজন্মের অনেকে মাটির বিস্কুটের কথা শুনলে অবাকই হন। এক সময় সিলেট অঞ্চলের মানুষের লোকবিশ্বাস ছিল, মাটির বিস্কুট শরীরের রক্তশূন্যতা দূর করে এবং খনিজের জোগান দেয়।
মৌলভীবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী টিসি মার্কেটের ব্যবসায়ী সবুজ মোদক বেশ কয়েক বছর ধরে মাটির বিস্কুট বিক্রি করেন। তিনি চিড়া, মুড়ি, গুড়, খই-এর সঙ্গে ছিকরও রাখেন। মাঝেমধ্যেই কেউ কেউ ছিকরের খোঁজ করেন।
আগে প্রচুর বিক্রি হতো। এখন অনেকটা কমে গেছে। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ থেকে ছিকর আনা হয়। তিনি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন ছিকর বিক্রি করেন। মৌলভীবাজারে প্রতি কেজি ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
ছিকর স্বাস্থ্যসম্মত কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ফারাজানা শিফা বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকায় যুগ যুগ ধরে মানুষ বিশেষ করে নারীরা অন্তঃসত্ত্বাকালীন মাটির বিস্কুট খেয়ে আসছেন। এটি খাওয়া ক্ষতিকর কি না এ বিষয়ে পরীক্ষালব্ধ কোনো তথ্য নেই। ছিকর মাটি দিয়ে বানানো হয়। মাটি যতই উন্নতমানের হোক না কেন তাতে ভাইরাস ও কৃমির ডিম থাকতে পারে। ফলে এটি খেলে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা হওয়া অমূলক নয়।’