প্রণোদনাতেও খেলাপির ভয়

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ও পুনঃঅর্থায়নের প্যাকেজ ঘোষণা করলেও অর্থ বিতরণে গতি নেই। ১৫টি স্কিমের বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। মোট বরাদ্দের হিসাবে যা ১১ শতাংশের কিছু বেশি। এর বাইরে আরও প্রায় ৪ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ থাকলেও ঋণ বিতরণে ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়ার ঝুঁকিকে দেখছেন ব্যাংকাররা।

বিশেষ করে যেসব উদ্যোক্তার আগের ঋণ রয়েছে বা ব্যবসা দীর্ঘদিন বন্ধ, তাদের নতুন করে ঋণ দিতে ঝুঁকি দেখছেন তারা। ব্যাংকাররা বলছেন, প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ মূলত কম সুদে বা বিশেষ সুবিধায় উদ্যোক্তাদের দেওয়ার কথা। কিন্তু ঋণ দেওয়ার পর গ্রাহক তা পরিশোধ করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ওপরই ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থের ব্যবস্থা থাকলেই ব্যাংকগুলো দ্রুত ঋণ দিতে পারছে না। গ্রাহকের ব্যবসা সচল করার সক্ষমতা, পুরনো ঋণের অবস্থা, জামানত ও ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে সবচেয়ে বেশি অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। এ স্কিমে বিতরণের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিশেষ স্কিমে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্কিমে ১ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্কিমে ১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ২ হাজার কোটি টাকার চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানিমুখী স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৯০ কোটি টাকা। ২০ হাজার কোটি টাকার বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরায় চালুর প্রাক্-অর্থায়ন স্কিমে এখন পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ স্কিমের মোট বরাদ্দের শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশের মতো বিতরণ করা হয়েছে। অথচ বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই ছিল এ স্কিমের বড় উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে ৩ হাজার কোটি টাকার কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার স্কিম, ৩ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি বহুমুখীকরণ স্কিম, ১ হাজার কোটি টাকার গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতিশীলতা আনার স্কিম এবং ২ হাজার কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানিমুখী করার স্কিমে এখনো কোনো অর্থ বিতরণ করা হয়নি।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বন্ধ শিল্পে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠানের পুরনো ঋণ রয়েছে। কারও কারও খেলাপি ঋণও আছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় নতুন অর্থায়নের পর তারা বাজারে টিকে থাকতে পারবে কি না, সেটিও দেখতে হয়। তিনি বলেন, ‘কাগজ-কলমে প্রতিষ্ঠান থাকলেই ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। নতুন অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি টেকসইভাবে ব্যবসা করতে পারবে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।’

ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ অনেক বেশি। ফলে নতুন করে ঋণ দিলে এবং সেটি আবার খেলাপি হলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ বাড়বে। এ কারণে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণেও ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন ঋণের বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে। সরকার চাচ্ছে দ্রুত ঋণ বিতরণ হোক। তবে প্রণোদনার অর্থ যাতে মিসইউজড না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যোগ্য উদ্যোক্তাদের দ্রুত অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য।

ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ নিতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তাও বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের পুরনো ঋণ রয়েছে, তাদের নতুন অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব-নিকাশ দুর্বল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জামানত ও ব্যাংকিং রেকর্ডের ঘাটতিও রয়েছে। ফলে আগ্রহ থাকলেও অনেক উদ্যোক্তা ঋণ অনুমোদনের পর্যায়ে আটকে যাচ্ছেন।

ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও গ্রাহক এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বিতরণে ধীরগতি তৈরি করছে।

তারা জানান, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে জামানতের বিষয়টিও (কোল্যাটেরাল) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভালো ও সক্ষম গ্রাহকদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক জামানতসংক্রান্ত শর্ত কিছুটা শিথিল করে পুনরায় পরিপত্র জারি করলে ঋণ বিতরণ আরও সহজ হতে পারে। প্রকৃত উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পেলে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়ানোর সুযোগ পাবেন।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়াতে চাইলেও গ্যাস-জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই ঋণ বিতরণ করা সম্ভব নয়; উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় ফেরার সক্ষমতা ও আস্থা তৈরি করাও জরুরি।’

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ নিতে ব্যবসায়ীদের অনীহার চেয়ে বিভিন্ন শর্ত ও প্রক্রিয়াগত জটিলতাই বড় বাধা। অনেক উদ্যোক্তা ঋণ নিতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাংকের যাচাই-বাছাই ও ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় পিছিয়ে যাচ্ছেন।’

প্রণোদনার শর্ত হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারের মাধ্যমে কিছু নির্দেশনাও দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে ঘোষিত কিংবা ভবিষ্যতে ঘোষিতব্য যেকোনো প্রণোদনা প্যাকেজ অথবা অন্য কোনো নীতিসহায়তা পাওয়ার আগে আবেদনকারীর বিরুদ্ধে নয়; বরং আবেদনকারীর পক্ষ থেকে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে করা মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টি যাচাই করতে হবে। আবেদনকারীর করা রিট পিটিশন বা অন্য কোনো মামলা অনিষ্পন্ন থাকলে তা প্রত্যাহারের পরই তার আবেদন বিবেচনা করা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ক্ষেত্রে গ্রাহককে প্রত্যাহার করা মামলার তালিকা আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে তার দায়ের করা কোনো মামলা অনিষ্পন্ন নেই, মর্মে গ্রাহকের কাছ থেকে একটি হলফনামা নিতে হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট তাসকিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে ব্যবসায়ীদের কোনো অনীহা নেই; বরং ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত কড়াকড়ি ও নীতিগত জটিলতাই দায়ী। প্রথমত বিপুল খেলাপি ঋণের ভয়ে ব্যাংকগুলো চরম সতর্কতায় দীর্ঘমেয়াদি যাচাই-বাছাই করছে এবং বন্ধ বা রুগ্ন কারখানাকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করে ঋণ দিতে চাইছে না। দ্বিতীয়ত ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া কঠোর আইনি শর্ত ও উপযুক্ত জামানত প্রদর্শন করতে না পারায় অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর আবেদন শুরুতেই বাতিল হয়ে যাচ্ছে।’

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ দ্রুত বিতরণ করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে বন্ধ শিল্পে ঋণ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। তিনি বলেন, শুধু প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে এবং তাকে চালু করতে অর্থ প্রয়োজন, এ যুক্তিতে ঋণ দেওয়া ঠিক হবে না। নতুন অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি টেকসইভাবে চালু করা সম্ভব কি না, তা দেখতে হবে। তা না হলে আজকের প্রণোদনা ঋণ আগামী দিনের খেলাপি ঋণে পরিণত হতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ঋণ বিতরণ এবং ব্যাংকের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। তাড়াহুড়ো করে ঋণ বিতরণ করলে নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। আবার অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই ও কঠোর শর্তের কারণে অর্থ বিতরণে গতি না এলে প্যাকেজের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ফলে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ এখন শুধু অর্থের জোগানের বিষয় নয়; বরং ব্যাংক কতটা ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দেবে এবং উদ্যোক্তা সেই ঋণ নিয়ে টেকসইভাবে ব্যবসা চালাতে পারবেন কি না, সেটিই হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।