মেসি, মেসি, মেসি তিনবার এই নামটি উচ্চারণ করলাম এই কারণে যে, একই সঙ্গে জাদুকরী ফুটবল খেলা, বদান্যতা ও বিশ্বখ্যাতি অর্জন কেবল একজনেরই ছিল। বিদায় ফুটবলের বাঁ পায়ের জাদুকর। বিদায় ভদ্রতা আর নম্রতার প্রতীক। বিদায় বিশ্বফুটবলের অন্যতম সেরা খ্যাতি অর্জন করা লিওনেল মেসি।
ফুটবল জীবনে অনেক কিংবদন্তিকে দেখেছি। মাঠে খেলেছি, অনেক বড় খেলোয়াড়ের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছি, আবার অনেককে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু লিওনেল মেসির মতো একজনকে দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা। আমার মনে হয়, মেসির বিদায়ের সঙ্গে শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় হচ্ছে না; শেষ হচ্ছে ফুটবলের একটি বিশেষ যুগ।
মেসির মতো ফুটবলার পৃথিবী আবার পাবে কি না, আমি জানি না। সত্যি বলতে, এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ মেসি শুধু গোল করতেন না, শুধু অ্যাসিস্ট করতেন না, শুধু ড্রিবলিং করতেন না, তিনি ফুটবলটাকে অন্যভাবে দেখতেন। আমরা যেখানে মাঠের একটা অংশ দেখতাম, মেসি সেখানে কয়েকটি সম্ভাব্য পথ একসঙ্গে দেখতে পেতেন।
তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ক্রিয়েটিভিটি। বল পায়ে নেওয়ার পর তিনি কী করবেন, সেটা অনেক সময় প্রতিপক্ষের তো দূরের কথা, সতীর্থরাও বুঝতে পারত না। একমুহূর্তে দুই-তিনজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, অসম্ভব কোণ থেকে পাস দেওয়া কিংবা হঠাৎ এমন একটি জায়গায় বল পাঠানো, যেখানে সতীর্থের পৌঁছানোর কথা ভাবাই যায় না এসব ছিল মেসির স্বাভাবিক ব্যাপার। আর তার বাঁ পা! ফুটবলে ‘জাদু’ শব্দটি যদি সত্যিই কোনো খেলোয়াড়ের জন্য ব্যবহার করা যায়, তাহলে মেসির বাঁ পায়ের জন্যই করা যায়। বলটা যেন তার পায়ের সঙ্গে কথা বলত। ছোট ছোট টাচ, শরীরের সামান্য দোল, গতি পরিবর্তন সব মিলিয়ে তিনি ডিফেন্ডারকে এমনভাবে বিভ্রান্ত করতেন যে মনে হতো, খেলোয়াড়টি নয়, সময়টাই যেন একমুহূর্তের জন্য থেমে গেছে।
মেসির ড্রিবলিংয়ের সৌন্দর্য ছিল এর সরলতায়। তিনি অযথা কসরত করতেন না। যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই করতেন। দুই পা, এক শরীরের ভঙ্গি, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ম্যাচের চেহারা বদলে দেওয়া এটাই ছিল তার শিল্প। তবে মেসিকে শুধু পায়ের জাদু দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নেতৃত্ব আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। একটা সময় বলা হতো মেসি খুব চুপচাপ, তিনি নেতৃত্ব দেন না। কিন্তু আমি মনে করি, নেতৃত্ব সবসময় চিৎকার করে দিতে হয় না। কখনো কখনো নেতৃত্ব মানে হলো সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে সামনে দাঁড়ানো। মেসি সেটাই করেছেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে শুরুর বছরগুলোতে তিনি যে সমালোচনা পেয়েছেন, যে হতাশা সহ্য করেছেন, সেসব পেরিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছেন। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলোর একটি। এরপর ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাও জিতেছেন। জাতীয় দলের হয়ে তার দীর্ঘ যাত্রা শেষ হয়েছে ১২৫ গোল ও ২০৭ ম্যাচে, সংখ্যাগুলো তার প্রভাবের কেবল একটি অংশ।
আমার কাছে মেসির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো প্রতিভা একা যথেষ্ট নয়। প্রতিভার সঙ্গে থাকতে হয় অধ্যবসায়, মানসিক শক্তি এবং দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। মেসি বছরের পর বছর নিজের খেলাকে বদলেছেন। তরুণ বয়সে তিনি ছিলেন দুরন্ত ড্রিবলার; পরে হয়ে উঠেছেন অসাধারণ প্লেমেকার; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়েছেন মাঠের কৌশলী নেতা। মেসি আমাদের শিখিয়েছেন, ফুটবল শুধু শক্তির খেলা নয়; এটি বুদ্ধিরও খেলা, অনুভূতিরও খেলা, সৌন্দর্যেরও খেলা।
আজ তিনি আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রেখেছেন। হয়তো একদিন পুরোপুরি ফুটবল থেকেও বিদায় নেবেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া দৃশ্যগুলো কোথায় যাবে? গোলের পর গোল, অবিশ্বাস্য পাস, একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া, ফ্রি-কিকের নিখুঁত বাঁক এসব তো ফুটবলের ইতিহাসে থেকে যাবে। আমার মনে হয়, বিদায়ে কেবল তার সতীর্থরাই নয়, কেঁদেছে পুরো বিশ্ব।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল মেসির কাছাকাছি থাকার। ২০১১ সালে নাইজেরিয়ার সঙ্গে ঢাকায় একটি ম্যাচ খেলতে এসেছিল মেসি। তখন আমি প্রায় ৪৮ ঘণ্টা তার কাছাকাছি ছিলাম। ওই সময় আমি তখনকার আর্জেন্টিনার একটি জার্সিতে মেসির অটোগ্রাফ পেয়েছিলাম। এটাও আমার একটি সৌভাগ্যের প্রতীক। সেই জার্সিটি আজও আমার ছেলে তাহসিন গাফ্ফার নিজের কাছে রেখে দিয়েছে যত্নসহকারে।
একজন সাবেক ফুটবলার হিসেবে আমার আফসোস একটাই মেসির খেলা আরও কিছু বছর চোখের সামনে দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ফুটবলে বিদায় বলে একটা সময় আসতেই হয়। আর মেসির ক্ষেত্রে সেই বিদায়টা যেন আরও কঠিন। কারণ আমরা জানি, মেসি চলে গেলে মাঠে আরেকজন খেলোয়াড় আসবেন। নতুন তারকা আসবেন, নতুন রেকর্ড হবে, নতুন গোল হবে। কিন্তু মেসির মতো মেসি, হয়তো আর আসবেন না। একটা যুগ শেষ হলো। এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, ফুটবল আবার কখন এমন একজন শিল্পীকে জন্ম দেয়, যার পায়ের কাছে বল শুধু বল থাকে না, হয়ে ওঠে এক টুকরো জাদু।