নদনদীর অস্তিত্ব সংকটের দৃশ্যমান প্রেক্ষাপট   

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ার সুবাদে এদেশের মানুষের জীবন-জীবিকাসহ জনজীবনে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাস পর্যালোচনায় এটি সুস্পষ্ট যে, সুপেয় পানি-চাষাবাদ-যাতায়াতের সুবিধার্থে পৃথিবীর প্রাচীন সব সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল নদীকে কেন্দ্র করেই। এদের মধ্যে ইরাকের ইউফ্রেটিস-তাইগ্রেস নদের সুমেরীয় সভ্যতা, সিন্ধু নদের মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা সভ্যতা, চীনের হোয়াংহো-ইয়াংসি নদী সভ্যতা এবং মিসরীয়দের নীল নদের সভ্যতা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশেরও সভ্যতা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যসহ মানুষের জীবন-অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে নদনদীগুলোর নিগূঢ় সম্পর্ক অনস্বীকার্য। দেশের ও জনগণের বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক কল্যাণে নদীর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কালক্রমে দেশের নদনদীগুলো আশীর্বাদের পরিবর্তে আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, মানবসৃষ্ট কারণসহ যথাযথ নদীশাসনের অভাবে প্রতি বছরই প্রধান প্রধান নদীর তীর ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, হাটবাজারসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা। নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিনই নিঃস্ব হচ্ছে নদী পাড়ের মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

বিগত একশ বছরের বেশি সময় ধরে সবচেয়ে বেশি ভাঙন হয়েছে পদ্মা নদীর। নিকট অতীতে মহাকাশবিষয়ক সংস্থা নাসার গবেষণায় বলা হয়, ১৯৬৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৬৬ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। নাসার গবেষণা প্রতিবেদনে এর বহুমাত্রিক প্রেক্ষাপটও উঠে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, নদনদীর অস্তিত্ব সংকটের অনেক কারণ দৃশ্যমান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ডিসকভার জিওসায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, পদ্মার উত্তর তীরের প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা চরম নদীভাঙনের শিকার। এই তীরে বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৪৪ মিটার করে ভূমি নদীগর্ভে মিশে গেছে। কিছু জায়গায় ভাঙনের ভয়াবহতা এতই বেশি যে, বছরে সর্বোচ্চ ৯৭ মিটার পর্যন্ত ভূমি হারিয়ে গেছে। গত ৫০ বছরে উত্তর তীরের কোনো কোনো স্থানে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিশ্বে প্রশস্ত নদীগুলোর ভাঙনের বৈশ্বিক গড় হার বছরে ১ দশমিক ৫২ মিটার। সেই হিসাবে পদ্মার উত্তর তীরের ভাঙন বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৮০ ভাগই নদনদী অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত। নদনদীর তটরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার তটরেখা নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের ৮৫টি শহর ও বন্দরসহ মোট ২৮৩টি স্থানে নিয়মিত প্রতি বছর নদীভাঙন পরিলক্ষিত হয়। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গণমাধ্যমে প্রকাশিত পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়াধীন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, গত পাঁচ দশকে নদীভাঙনে দেশের প্রায় ১ হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার জমি স্থায়ীভাবে হারিয়েছে, যা পুরো ঢাকা শহরের প্রায় চার গুণ। সংস্থাটির হিসাবে প্রতি এক বর্গকিলোমিটার নদীভাঙনে প্রায় ১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সার্ভে (এসভিআরএস)-এর ২০২২ ও ২০২৩ সালের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ৩৫০০-এর অধিক পরিবার এবং গড়ে ১৫ হাজারের অধিক মানুষ নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। জলবায়ুকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি সাতজন মানুষের একজন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। এর মধ্যে নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার হার হবে মোট বাস্তুচ্যুতির প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ।   

গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর ৫৪টি এসেছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মেঘালয় ও আসাম থেকে এবং তিনটি এসেছে মিয়ানমার থেকে। সমসূত্র মতে, বহুকালব্যাপী ভারতের একতরফা অভিন্ন নদীশাসনের ফলে ভাটি অঞ্চলে বাংলাদেশের নদনদীর পানি প্রবাহ কমে বিস্তীর্ণ এলাকায় চর জেগে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত। ফলে সময়ের পরিক্রমায় হ্রাস পাচ্ছে দেশের নদনদীর সংখ্যা। সরকারি ত্যথমতে, দেশে নদনদীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০০টি। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের নদনদী শীর্ষক গ্রন্থ অনুসারে, দেশে নদনদীর সংখ্যা ৩১০টি। পরবর্তী সময় ২০১১ সালে নদনদীর সংখ্যা হয় ৪০৫টি। বেসরকারি হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ২৩০। গবেষকদের মতে, প্রতি বছর গড়ে ১০টি নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইতিমধ্যে দখল ও দূষণের কারণে বিলীন হয়ে গেছে ২৫টি নদী। বর্তমানে বিপন্ন নদীর সংখ্যা ১৭৪টি। এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য, দেশের প্রায় সব এলাকার নদী-খাল-বিল অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত পানিপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ফলে নদনদীর সংকীর্ণতায় বর্ষাকালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে গ্রামীণ এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে ফসল ও বাড়িঘর তলিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে শহরাঞ্চলের ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়ে বৃষ্টি-অতিবৃষ্টিতে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। এতে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে। নদী কখনো একা মরে না। নদীর মৃত্যু হলে পাড়ের জনপদও একটু একটু করে মরতে শুরু করে। রাজধানী ঢাকা যদি বুড়িগঙ্গার মৃত্যুর কারণ হয়, তবে নদীর মৃত্যুতে ঢাকার অবস্থাও এখন মুমূর্ষু প্রায়! বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বংশী, বালু এবং শীতলক্ষ্যা নদীর দুধারে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যরে বিষক্রিয়ায় এসব নদী ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন দ্রুত নদীশাসনের ব্যবস্থা।

ভুল নদীশাসন, দখল ও দূষণের কারণে এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে দেশের সিংহভাগ নদী। ঢাকাসহ বাংলাদেশের নদীগুলোর দখল ও দূষণমুক্ত করতে আদালত থেকেও বারবার নির্দেশনা এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই নদীর ওপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখলেও পরক্ষণেই নদীগুলো আবার দখল হচ্ছে। নদীর অবৈধ দখল, পানি-পরিবেশদূষণ, শিল্প কারখানা কর্তৃক নদীদূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণসহ নানাবিদ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, নৌপরিবহনযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন করেও এর সুফল পাওয়া যায়নি। ২০২০ সালে এটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে খসড়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০ প্রণয়ন করা হয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০-এর উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের সব নদ-নদী-জলাধার-খাল-বিল-সমুদ্র উপকূল-হাওর-বাঁওড়-জলাভূমি-জলাশয়-ঝর্ণা-হ্রদসহ পানির উৎস সব কিছুই এর আওতার মধ্যে থাকবে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান সব নদনদী আইনি ব্যক্তি ও জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচিত হবে, একই মর্যাদাপ্রাপ্ত হবে। সেই সঙ্গে সব নদনদী পাবলিক ট্রাস্ট ডকট্রিনের আওতায় হাওয়ায় সেগুলো জনসম্পত্তি বলে বিবেচিত হবে। সরকারি কোনো কর্মকর্তাও যদি নদনদীর জায়গা, তীরভূমি ইত্যাদি অবৈধভাবে কারও নামে বরাদ্দ করেন, তারাও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে দোষী হবেন। প্রতিটি বিভাগে ‘নদী রক্ষা কোর্ট’ নামে এক বা একাধিক কোর্ট স্থাপিত থাকবে। নদী ও জলাধার সংক্রান্ত সব বিষয় নিয়ে এই আদালত বিচার করবে। এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে। নদী দখল, দূষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দিতে পারবে মোবাইল কোর্ট। কমিশন ছাড়াও নদী রক্ষার্থে যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি না নাগরিক কোর্টে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পুনরুদ্ধার ও দূষণ রোধের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে পারবেন। দুর্ভাগ্যবশত কাগজে কলমে বা নীতিনির্ধারণে বিষয়গুলো উঠে এলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্র মোটেও সন্তোষজনক নয়। পতিত সরকারের উদাসীনতাই চরম ঝুঁকিতে ঠেলে দিয়েছে নদীভাঙনের আহাজারি।   

নদীভাঙন রোধ করার জন্য নদীপৃষ্ঠ থেকে পাড়ের উচ্চতায় বড় বড় পাথর ফেলে বা কংক্রিটের তৈরি বিশাল আকারের নানা রকমের ব্লক দিয়ে জলের স্রোতের গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে ভূমিক্ষয় রোধ এবং পাড়ের মাঝে বাঁধ দিয়ে পাড় ভাঙন রোধে কার্যকরভাবে নদীশাসন করতে হবে।

নদীর নাব্য ও গভীরতা বজায় রাখার নিমিত্তে নদীর তলদেশ থেকে বালি উত্তোলন, পানিপ্রবাহ ও নদীর পরিবেশ ধরে রাখা আবশ্যক। এ ছাড়াও নদীশাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বড় ধরনের জলাধার নির্মাণ, হাওর অঞ্চলের সংস্কারপূর্বক পানি ধারণ ও পানির গুণগত মান বাড়ানোর মতো নানা উদ্যোগ গ্রহণ করার ফলে দেশে মরুকরণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানির চাপ প্রতিরোধ এবং অনাকাক্সিক্ষত বন্যাও রোধ করা সম্ভব হবে। নদীভাঙন রোধে গৃহীত বৈশ্বিক ব্যবস্থাগুলোকেও যথাযথ আমলে নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘকালব্যাপী বাচনিক প্রতিশ্রুতিতে নদীশাসনের অব্যবস্থাপনায় জনদুর্ভোগ লাঘবে দৃশ্যমান কার্যক্রম তেমন পরিলক্ষিত না হলেও এ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের মনোযোগ অতীব জরুরি। নদী-খালপাড়ের ভাঙন রোধ, উপকূলীয় বাঁধ সংরক্ষণ এবং সড়ক-রেললাইনের পাশে কংক্রিটের ব্লক ও জিও ব্লকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব-টেকসই বিকল্প হিসেবে বিন্না ঘাস ব্যবহারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত। 

লেখক : শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানি ও জলবায়ু বিশ্লেষক

chowiu@yahoo.com